Gopal Bhar Golpo Collection 2021 | বাংলা মজার গল্প

হেলো বন্ধুরা, www.bengalishayari.in -এ আপনাদের স্বাগতম। হেডিং দেখে বুঝতেই পেরেছেন পোস্ট টি কিসের সমবন্ধে লেখা হয়েছে। হা আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নবরত্ন Gopal Bhar। নিচের পোস্ট এ গোপাল ভাঁড় সমবন্ধে বাছাই করা কিছু Gopal Bhar Golpo পোস্ট করলাম। Gopal Bhar Golpo গুলি আপনাদের কেমন লাগলো নিচের কমেন্ট বক্স এ Comment করে জানাবেন।

গোপাল ভাঁড় : গোপাল ভাঁড়ের আসল নাম হল – গোপাল চন্দ্র প্রামানিক। তিনি মধ্যযুগীয় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার সর্বশ্রেষ্ঠ নবরত্ন ছিলেন। গোপাল ভাঁড়ের চরিত্রটি নিয়ে এখনো বিভিন্ন ঐতিহাসিক এবং গবেষকদের মধ্যে থেকে গেছে। Gopal Bhar Golpo( গোপাল ভাঁড়েড় গল্প) এখনো ছোট থেকে বড়ো সবার কাছে খুবই শিক্ষামূলক ও কৌতুকময়। ছোটবেলায় শোনা এই গল্পগুলি সকলের জন্যেই শিক্ষামূলক গুরুত্বপূর্ণ।

Gopal Bharer Hashir Galpo is a funny story book of Gopal Bhar. Gopal Bhar is one of the funniest characters in Bengali literature and entertainment. He is very intelligent and bravely man, no one can beat him in any stem or moment or any discussion. When he decides to do something, he must completes that with proper way.

Table of Contents

Gopal Bhar Golpo

Gopal Bhar
gopal bhar golpo

চোরের আজব সাজা

একদিন গোপালের জ্বর হওয়ায় সে সেদিন রাজসভায় যেতে পারেনি। মহারাজ সভাসদদের নিয়ে নানা আলাপ আলোচনা করতে করতে হঠাৎ বললেন, আমার সভার মধ্যে এমন কি কেউ আছে, যে গোপালের ঘর থেকে কিছু চুরি করে আনতে পারে? যদি কেউ পারে, তবে সে সামান্য জিনিস হলেও আমি তাকে বিশেষভাবে পুরষ্কৃত করব। তোমরা কেউ রাজী থাকলে বল।
মহারাজের পুরষ্কার লোভেও কেউ রাজি হল না গোপালের ঘরে চুরি করতে। কারণ বড় চতুর সে। তার চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। ধরা পড়লে নাকালের শেষ থাকবে না। নাকানি চোবানি তো খেতে হবেই, আর সে তার প্রতিশোধ একদিন না একদিন নেবেই নেবে এবং অশেষ দুর্গতির সীমা থাকবে না।

ভূপাল নামে একটি লোক পুরষ্কারের লোভে সেদিন মধ্যরাত্রে গোপালের বাড়িতে সিদ কেটে প্রবেশ করল। গোপাল আগে থেকেই রাজসভার কথা জানতে পেরেছিল, তাই সে লোভি লোকটাকে জব্দ করার জন্য তৈরি হয়ে রইল। গোপালের ঘরের দেওয়ালে সিদ। গোপাল পূর্ব প্রস্তুতি মতো একটা মানুষের বিষ্ঠাপূর্ণ কলসির উপরে গোটাকতক টাকা রেখে দিয়েছিল এবং সেখানে নিজে একপাশে আত্নগোপন করে দাঁড়িয়ে রইল।

লোকটি সিদ কেটে যখন ঘরের মধ্যে মাথা গলিয়ে ঢুকে দেখল যে, সামনেই একটা টাকভর্তি কলসী বসানো আছে। সে আর কালবিলম্ব না করে তাই মাথায় তুলে নিয়ে মনের আনন্দে রাজবাড়িরে দিকে এগোতে যেতেই গোপাল ঢিল ছুঁড়ে ব্রাহ্মণের মাথার কলসীটা ভেঙে দিল। কলসী চুরমার হয়ে সঙ্গে সঙ্গে লোকটির সারা শরীর বিষ্ঠাতে পূর্ণ হয়ে গেল। তখন ভোর হয়েছে। গোপাল বেরিয়ে বলল, কি বাবা চুরি করা হল। মহারাজ পরে গোপালের মুখে এসব কথা শুনে বেশ আনন্দিত হলেন।

রাম নাম জপলে ভূত ছাড়ে

বেড়াতে বেরিয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র একবার গোপালের হাত চেপে ধরে আস্তে আস্তে মোচড়াতে লাগলেন।
গোপাল: আমার হাত নির্দোষ, ওকে রেহাই দিন।
রাজা: জোর করে ছাড়িয়ে নাও।
গোপাল: সেটা বেয়াদবি হবে।
রাজা: উহু, তাহলে হাত ছাড়ব না।
গোপাল তখন যে রোগের যে দাওয়াই বলে রাম নাম জপতে থাকলেন।
রাজা: এতে কি আর কাজ হবে? দাওয়াই কোথায়?
গোপাল: রাম নাম জপাই তো মোক্ষম দাওয়াই।
রাজা: মানে?
গোপাল: পিতামহ, প্রপিতামহের আমল থেকে শুনে আসছি, রাম নাম জপলে ভূত ছাড়ে।
রাজা গোপালের হাত ছেড়ে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে।

রাজবৈদ্য নিয়োগ

রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে রাজবৈদ্য নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশদেশান্তর থেকে চিকিত্সকেরা এলেন যোগ দিতে। গোপালকে রাজা দায়িত্ব দিলেন চিকিত্সক নির্বাচনের। গোপাল খুশিমনে বসলেন তাঁদের মেধা পরীক্ষায়।

—আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব আছে?

—জি আছে। প্রচুর ভূত। ওদের অত্যাচারে ঠিকমতো চিকিত্সা পর্যন্ত করতে পারি না। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই।
এবার দ্বিতীয় চিকিত্সকের পালা।

—আপনার চিকিত্সালয়ের আশপাশে ভূতের উপদ্রব কেমন?

—আশ্চর্য, আপনি জানলেন কীভাবে! ওদের জ্বালায় আমি অস্থির। দিন দিন ওদের সংখ্যা বাড়ছেই।

এভাবে দেখা গেল সবার চিকিত্সালয়ের আশপাশেই ভূতের উপদ্রব আছে। একজনকে শুধু পাওয়া গেল, যাঁর কোনো ভূতসংক্রান্ত ঝামেলা নেই। গোপাল তাঁকে রাজবৈদ্য নিয়োগ দিলেন। পরে দেখা গেল এই চিকিত্সকই সেরা। রাজাও খুশি। একদিন রাজা ধরলেন গোপালকে। গোপাল বললেন, ‘আজ্ঞে মহারাজ, দেখুন, সবার চিকিত্সাকেন্দ্রের আশপাশে ভূতের উপদ্রব শুধু বাড়ছে আর বাড়ছে। এর অর্থ হলো, তাঁদের রোগী মরে আর ভূতের সংখ্যা বাড়ে…আর যাঁকে নিলাম, তাঁর ওখানে কোনো ভূতের উপদ্রব নেই…অর্থাত্ তাঁর রোগীএকজনও মরে না।

আজ যে ভীম একাদশী

গোপাল একাদশী করত। তার একাদশী করা অভ্যাস। গোপাল একাদশীর দিন সন্ধ্যেবেলায় প্রসাদ পেত লুচি, মিষ্টি- নানাবিধ ফল সহকারে। সেদিন যেন মহোৎসব লেগে যেত। গোপালকে ওভাবে একাদশীর দিন ভোজন করতে দেখে তার এক চাকর বললে, সামনের তারিখ থেকে আমিও একাদশী পালন করব বাবু। আমার একাদশী করার খুব ইচ্ছে। আপনি যদি আদেশ দেন আমি একাদশী করি। আমার খুব ইচ্ছা।

গোপাল মুচকি হেসে বলল, খুবই ভাল কথা, এই তো চাই। একাদশী করা সকলের উচিৎ। দেহের উপকার, তার সাথেই মনেরও সাত্ত্বিকভাব সাধনের জন্য একাদশী সকলের করা উচিত। পরবর্তী একাদশীর তারিখে সকাল থেকে গোপালের সঙ্গে অভূক্ত রইল।

কিন্তু সাঁঝ গড়িয়ে রাত্রি গভীর হয় হয়, তখনও গোপাল ভোজন করছে না দেখে চাকরটি ধৈর্যহারা হয়ে জিজ্ঞাস করলে, বাবু প্রতি একাদশীতেই তো আপনি সূর্যাস্তের ঠিক পরেই প্রচুর ভাল মন্দ ভোজন করে থাকেন, কিন্তু আজ এখনও কিছু খাচ্ছেন না কেন?
গোপাল মুচকি হেসে বলল, ওরে ব্যাটা আজ যে যেমন তেমন একাদশী নয়, সাক্ষাৎ ভীম একাদশী- আজ একদম নিরম্বু উপবাস। আজকে জলও খেতে নাই । সেজন্য আজ আর কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করিনি।

গোপালের চাকর হায় হায় করতে লাগল। এমন হবে জানলে কি সে একাদশীর নাম মুখে আনতো। পেট যে চোঁ চোঁ করছে। সেই থেকে চাকর আর কোন দিন একাদশীর কথা মুখে আনল না ভুলেও। গোপালও মুচকি হেসে মনে মনে বলল বেটা আজ বেশ ভালরকম জব্দ হয়েছে, আর কোনওদিন একাদশীর কথা মুখেও আনবে না। সহজে মতলব হাসিল হল দেখে মনে মনে আর একচোট হেসেও নিল গোপাল। যেমন কর্ম তেমন ফল।

Gopal Bhar Golpo
Gopal Bhar Golpo

হাসি যে আর ধরে না দাদার

গোপাল গ্রামের এক মহাজনের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। আজ দেব, কাল দেব বলে সে টাকা আর শোধ করতে পারেনি। সেই লোক গোপালকে একদিন হাটের মধ্যে পাকড়াও করে বললে, আমার টাকাগুলো দিয়ে দাও তো গোপাল, নইলে আজ আর তোমার ছাড়ব না। তোমাকে এত লোকের সামনে অপমান করব, দেখি তুমি কোথা যাও বাছাধন।

মহাজনের দ্বারা অপমানিত হয়ে গোপাল বললে, টাকা কি দেব না বলছি? আপনার টাকা আগামী কালেই দিয়ে দেবো। পরশু সকালেই আমার বাড়িতে চলে আসুন। আমি টাকা শোধ করে দেব পরশুর মধ্যে সামান্য টাকার জন্য এত অপমান করার আপার দরকার ছিল না। আমি টাকা যেমন করে পারিশোধ করার ব্যবস্থা করবই।

গোপালের কথা শুনে মহাজন মনে মনে ভাবলেন গোপাল যখন এত লোকের সামনে কথা ছিল তখন পরশু দিন যেভাবেই হোক টাকা পরিশোধ করবেই। এই ভেবে পরমু মহাজন গোপালের বাড়িতে গিয়ে হাজির হল। কই হে গোপাল টাকা দেবে বলেছিলে দাও, আমি ঠিক সময় মত এসেছি। মহাজনের ডাক শুনে গোপাল বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে বললে, কাকভোরে ছুটে এসেছেন, দয়া করে বাড়ির দাওয়ায় একটু বিশ্রাম করুন- আমি যত তাড়াতাড়ি পারি আপনার টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করছি। আপনি কষ্ট করে এসেছেন প্রাণের টানে তাতেই আমি কৃতার্থ। আমার বাড়ি আজ পবিত্র হল।

মহাজন তো এখনই টাকা পাবে মনে ভেবে নিশ্চিত হয়ে গোপালের বাড়ির দাওয়ায় বসে হাটু দোলাতে রইল। কিছুক্ষণ পরে গোপাল আর গোপালের বড় ছেলে, সামনের খোলামেলা বেশ বড় বাগান ছিল, তাতে পাঁচ হাত অন্তর বেশ কয়েকটি নারকেল চারা পুতঁতে লাগল মনোযোগ সহকারে। তা দেখে মহাজন গোপালকে অস্থির হয়ে বললে, এ কি করছে গোপাল? আমার যে বেলা হয়ে যাচ্ছে। কাজকর্ম আছে যে। গদিতে যেতে হবে, সকালে উঠেই এসেছি জলখাবারও খাওয়া হয়নি। বাড়ীতে লোকজন আসবে, শ্রীঘ্র কর।

গোপাল নারকেলের চারা পুঁততে পুঁততে বললে দেখছেন, তো চারা পুঁতছি। একটু বসুন না। এখনি হয়ে যাবে পোতাঁ। আপনার টাকার ব্যবস্থা করে তবে আজ জলগ্রহণ করবো বলছি। এই দেখুন। করছি কিনা আপনি আর একটু বসে নিজে দেখুন। আপনি অপেক্ষা করুন, হলো বলে। বিশ্বাস না হয় উঠে এসে দেখুন।

কাজ শেষ করে গোপাল কাছে এসে দাড়াঁতেই মহাজন জিজ্ঞেস করলে, সেই থেকে তো বসিয়ে রেখেছো- একটা তামাকও দিলে না, যাক্ কই টাকা দাও। আমার তাড়া আছে।

গোপাল মুচকি হেসে বললে, এতক্ষণ ধরে তো আপনার টাকা শোধের ব্যবস্থাই করলুম মশায়।

তার মানে তুমি তো এখন নারকেলের চারা পুতলে। আমার টাকার ব্যবস্থা করলে কি করে?

গোপাল বললে, এই যে নারকেলের চারা পুতলাম তাতে নারকেল গাছ হবে এবং এতগুলো নাকেল গাছে যা ফল হবে তা তো আর কম নয়। দুবছরের নারকেলের টাকায় আপনার সব দায় দেনা শোধ হয়ে যাবেই। আপনাকে যখন কথা দিয়েছি আজই টাকা শোধের ব্যবস্থা করব, তাই ব্যবস্থা করে দিলাম। দুবছরের জন্য নারকেলের ইজরাও আপনাকে দিয়ে এলুম। আর ভাবছেন কেন, ধরুন আপনার টাকা বলতে গেলে নিশ্চিন্তে পেয়েই গেলেন সুদ সমেত।

গোপালের কথা শুনে পাওনাদার হাসবে না কাঁদবে ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত বেচারা হেসেই ফেলল।

গোপাল বললে, এখন কি না টাকাটা নগদ পেয়ে গেলেন বলে হাসি আর ধরে না যে দাদার।

গোপাল যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি

গোপাল যাচ্ছে শ্বশুরবাড়ি। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে গোপাল এক গাছের নিচে বিশ্রাম নিতে বসল। বেশি গরম লাগায় ফতুয়াটা খুলে পাশে রেখে একটু আয়েশ করে বসল। বসে বিশ্রাম নিতে নিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, নিজেই জানে না।
ঘুম যখন ভাঙল গোপাল দেখে, তার ফতুয়াটা চুরি হয়ে গেছে। হায় হায়! এখন কী হবে! খালি গায়ে তো আর শ্বশুরবাড়ি ওঠা যায় না। কী আর করা।

সে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলতে লাগল, ‘হে ভগবান, রাস্তায় অন্তত ১০টি মুদ্রা যেন কুড়িয়ে পাই, তাহলে পাঁচ মুদ্রায় আমার জন্য একটা ভালো ফতুয়া কিনতে পারি। আর তোমার জন্য পাঁচটি মুদ্রা মন্দিরে দান করতে পারি•••।’ আর কী আশ্চর্য! ভাবতে ভাবতেই দেখে, রাস্তার ধারে কয়েকটি মুদ্রা পড়ে আছে। খুশি হয়ে উঠল গোপাল, গুনে দেখে পাঁচটি মুদ্রা! গোপাল স্বগত বলে উঠল, ‘হে ভগবান, আমাকে তোমার বিশ্বাস হলো না, নিজের ভাগটা আগেই রেখে দিলে?

ঘটি যেনো না ভাঙে

রামবাবুর সাথে গল্প করতে করতে গোপালের খুব তেষ্টা পেয়েছে। সে ওর ভৃত্যকে ডেকে ঠাস ঠাস তিনটে চড় লাগিয়ে দিয়ে বলছে, ‘যা এক ঘটি জল নিয়ে আয় ঘটি যেনো না ভাঙে।’ ব্যাপার দেখে রামবাবু বলছে, ‘গোপাল, ঘটি ভাঙার আগেই ওকে চড় মেরে বসলে যে?’ গোপাল জবাব দিচ্ছে, ‘আরে ভেঙে ফেলার পর মেরে কি আর লাভ আছে? এর চেয়ে আগেই মেরে দিলাম। সাবধান থাকবে।’

দক্ষিণ দিকে মুখ

গোপাল বেয়াই-বেয়াইনের সাথে বেড়াতে গিয়ে এক ঝোপের আড়ালে প্রস্রাব করতে বসেছে। বেয়াই বলছে, ‘গোপাল উত্তর দিকে মুখ করে প্রস্রাব করছো, ওদিকে মুখ করে প্রস্রাব করা শাস্ত্রে মানা আছে।’ আবার বেয়াইন বলছে, ‘দক্ষিণ দিকে মুখ করে প্রস্রাব করাও শাস্ত্রে মানা।’ শুনে গোপাল বলছে, ‘আমরা ছোট মানুষ, বেয়াই যেই মুখ বললেন সেই মুখেও প্রস্রাব করি, আবার বেয়াইন যেই মুখ বললেন সেই মুখেও করি।’

পায়ে ব্যথা

একদিন এক প্রতিবেশী গোপাল ভাঁড়ের কাছে এসে :
‘আমাকে একটা চিঠি লিখে দাও।’
‘আমি চিঠি লিখতে পারবো না, আমার পায়ে ব্যথা।’
প্রতিবেশী আশ্চর্য হয়ে বললো, ‘চিঠি তো লিখবে হাত দিয়ে, পায়ে ব্যথা তাতে কী হয়েছে?’
‘কারণ আমি অতোদূর হেঁটে যেতে পারবো না।’
‘অতোদূর হাঁটতে পারবে না মানে?’
‘মানে আমার লেখা চিঠি আমি ছাড়া আর কেউ পড়তে পারবে না। আমার হাতের লেখা খুব খারাপ তো। যাকে চিঠি পাঠাবে, তাকে তো আমাকেই পড়ে দিয়ে আসতে হবে, তাই না? পায়ে ব্যথা নিয়ে যাবো কিভাবে?’

বৈরাগী ও গোপাল

একজন বৈরাগী গোপালকে চিনত না। সে গোপালের সামনে এসে বলল, “ঈশ্বরের সেবার জন্য আপনি কিছু চাঁদা দেবেন?”
গোপাল কিছু না বলে বৈরাগীকে একটা টাকা দিল।
টাকাটা পেয়ে বৈরাগী খুশি হয়ে পথ হাঁটতে লাগল। কিছুটা যেতেই গোপাল তাকে ডাকল, “ও বৈরাগী, একবারটি আমার কাছে এসো।”
বৈরাগী খুশিমনে তার কাছে আসলে গোপাল বলল, “তোমার বয়স কত?”
“আঠারো আজ্ঞে।”
“আমার বয়স পঞ্চান্ন।”
“তাতে কি হল?”
“এইমাত্র ঈশ্বরের সেবার জন্য যে একটা টাকা নিয়েছ সেটা ফেরত দাও, কারণ তোমার আগেই আমি স্বর্গে যাব এবং ঈশ্বরের সেবার সুবর্ণ সুযোগ পাব।”

চোখের সমস্যা

গোপালের তখন বয়স হয়েছে। চোখে ভালো দেখতে পারে না। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বললেন, কী গোপাল, গতকাল আসনি কেন?
—আজ্ঞে চোখে সমস্যা হয়েছে। সবকিছু দুটো দেখি। কাল এসেছিলাম। এসে দেখি দুটো দরবার। কোনটায় ঢুকব, ভাবতে ভাবতেই…।
—এ তো তোমার জন্য ভালোই হলো। তুমি বড়লোক হয়ে গেলে। আগে দেখতে তোমার একটা বলদ, এখন দেখবে দুটো বলদ।
—ঠিকই বলেছেন মহারাজ। আগে দেখতাম আপনার দুটো পা, এখন দেখছি চারটা পা…ঠিক আমার বলদের মতোই!

গোপাল, গোপাল

গোপাল ভাঁড় একবার তার ছেলেকে নিয়ে মেলায় বেড়াতে গিয়ে ছেলেকে হারিয়ে ফেলে। ছেলে তখন একটুও না ঘাবড়ে ‘গোপাল, গোপাল’ বলে চেঁচাতে থাকে। ছেলের চিৎকার শুনে গোপাল ছুটে এসে ধমক দেয় ছেলেকে, ‘ছিঃ ছিঃ, আমার নাম ধরে ডাকছিস, বাবা বলে ডাকতে পারিস না?’
ছেলে তখন বলল, ‘হুঁ, বাবা বলে ডাকি আর মেলার সব লোক ছুটে আসুক!’

গোপালের ভাইপো

গোপালের ভাইপো আর তার স্ত্রীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া হচ্ছে দেখে গোপাল তাদের থামাতে গেল। গোপালকে দেখে তার ভাইপো বলতে লাগল, ‘দেখুন তো কাকা, আমি আগামী বছর একটা দুধেল গাই কিনব আর তাই শুনে আমার বউ বলছে, সে নাকি গাইয়ের দুধ দিয়ে পায়েস বানিয়ে তার বাপের বাড়ির গুষ্টিকে খাওয়াবে•••।’ গোপাল হাত তুলে তাদের থামাল। ‘আস্তে•••’ ভাইপো থামল। এবার গোপাল ভাঁড় খেঁকিয়ে উঠল, ‘বদমাশ, তোর বউয়ের পায়েস তো পরে•••বাড়ির পিছে আমি যে শাক-সবজির বাগান করেছি, সেগুলো যে তোর গরু খাবে, সে খেয়াল আছে?’

Gopal Bhar Golpo
Gopal Bhar Golpo

গ্রামের মোড়ল

গোপাল একবার গ্রামের মোড়ল হয়েছিল। তো একদিন ভোরবেলায় এক লোক এসে ডাকতে লাগল, ‘গোপাল? গোপাল?’ গোপাল ভাঁড় কোনো উত্তর না দিয়ে শুয়েই রইল। এবার লোকটা চিৎকার করে ডাকতে লাগল, ‘মোড়ল সাহেব, মোড়ল সাহেব।’ এবারও গোপাল কোনো কথা না বলে মটকা মেরে শুয়ে রইল। গোপালের বউ ছুটে এসে বলল, ‘কী ব্যাপার, লোকটা মোড়ল সাহেব মোড়ল সাহেব বলে চেঁচিয়ে পড়া মাত করছে, তুমি কিছুই বলছ না!’ গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘আহা, ডাকুক না কিছুক্ষণ, পাড়ার লোকজন জানুক আমি মোড়ল হয়েছি।’

মন্দিরে কুকুর

মন্দিরে ঢুকতে যাবার সময় পেছন থেকে পন্ডিতের বাঁধা, ‘এ তুমি কী করছো গোপাল! মন্দিরে কুকুর নিয়ে ঢুকছো?’
‘কোথায় কুকুর?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে গোপাল।
‘এই তো তোমার পেছনে!’ একটি কুকুরের দিকে হাত তুলে দেখায় পন্ডিত।
‘এটি আমার কুকুর নয়!’
‘তোমার নয় বললেই হলো?’ রাগ দেখিয়ে বলে পন্ডিত, ‘তোমার পেছন পেছনেই তো যাচ্ছে!’
‘বটে? তা তুমিও তো আমার পেছন পেছন আসছো!’

গাধাও তামাক খায় না

গোপালের তামাক প্রীতি রাজা কৃষ্ণচন্দ্র মোটেই পছন্দ করতেন না। একদিন গোপালকে সঙ্গে নিয়ে পালকিতে কোথাও যাচ্ছেন, দেখেন তামাক ক্ষেতে এক গাধা চড়ে বেড়াচ্ছে। সেই গাধা ক্ষেতের আগাছা খাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তামাক পাতায় ভুলেও মুখ দিচ্ছে না।

সুযোগ পেয়ে রাজা বলেন, ‘দেখেছো হে গোপাল, একটা গাধাও তামাক খায় না!’

শুনে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে রাজা মশাই, তা যা বলেছেন। কেবল গাধারাই তামাক খায় না।’

মাছি

মিষ্টির দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময় থরে থরে সাজানো মিষ্টি দেখে গোপালের খুব লোভ হয়েছে। কিন্তু ট্যাকে নেই একটি পয়সাও।

ভেতরে গোপাল ঢুকে দেখে ময়রার ছোট ছেলেটি বসে আছে।
গোপাল শুধায়, ‘কি-রে, তোর বাপ কই?’
‘পেছনে। বিশ্রাম নিচ্ছে।’
‘তোর বাপ আমি আমি খুব বন্ধু বুঝলি? আমার নাম মাছি। ক’টা মিষ্টি খাই? তোর বাপ কিচ্ছু মনে করবে না।’ বলেই গোপাল টপাটপ মিষ্টি মুখে পুরতে শুরু করেছে।
মিষ্টি নিমিষে শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে ছেলে চেঁচিয়ে বলে বলে, ‘বাবা, মাছি কিন্তু সব মিষ্টি খেয়ে ফেলছে!’
শুনে পেছন থেকে ময়রা বলে, ‘আরে খেতে দে! মাছি আর কট্টুকু খাবে?’

বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন

রাজা কৃষ্ণচন্দ্র সব সভাসদদের সামনে গোপালকে জব্দ করার উদ্দেশ্যে বলছেন, ‘বুঝলে গোপাল, আমার সাথে তোমার চেহারার কিন্তু দারুণ মিল! তা বাবার শাসনামলে তোমার মা কি এদিকে আসতেন-টাসতেন নাকি?

’গদগদ হয়ে গোপাল বলে, ‘আজ্ঞে না রাজামশাই! তবে মা না এলেও বাবা কিন্তু প্রায়শই আসতেন!’

গাধা আর তোমার মধ্যে ব্যবধান

রাজা গোপাল ভাঁড় কে প্রশ্ন করল, গাধা আর তোমার মধ্যে ব্যবধান কতটুকু? গোপাল রাজা থেকে নিজের দুরত্ব টা মেপে তারপর জবাব দিল, বেশি না, মাত্র সাড়ে চার হাত ব্যবধান।

শালগ্রাম কলুষিত

একদিন এক পূজারী বামুন শালগ্রাম শিলা কাঁধে নিয়ে যজমান বাড়ি যাচ্ছেন, এমন সময়ে পথের মাঝে তাঁর ভয়ানক মলত্যাগের বেগ হল। অগত্যা সেই শালগ্রাম তিনি পাশে গাছের কাছে রেখেই অন্য এক গাছের আড়ালে বসে পড়লেন।

সেই পূজারী বামুন রাজবাড়িতেও পুজো করতেন। ব্রাক্ষ্মণের ভাগ্য মন্দ ঠিক সেই সময়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র যাচ্ছিলেন সেই পথে। রাজা দেখলেন পূজারী ঠাকুর নারায়ন রেখে গাছেন পিছনে বসে মলত্যাগ করছেন। রাজা পূজারী ঠাকুরকে চিনতে পেরেই চলে গেলেন রাজবাড়িতে।

সেই সময় সেই দিয়ে এক প্রতিবেশীও যাচ্ছিল। সে বামুনের কথা রাজাকে বলতে পরদিন পূজারী যখন রাজবাড়িতে পূজা করতে এসেছেন, তখন রাজার আদেশ শুনে তিনি হতবাক। পূজারী শালগ্রাম অপবিত্র করেছেন, এ পাপের শাস্ত্রমত প্রায়শ্চিত্ত তিনি যতদিন না করবেন, ততদিন আর রাজবাড়ির বিগ্রহের পূজা করতে তিনি পারবেন না। এমন কি, পূর্বের মত অন্য যজমানদের বড়ি পূজা অচ্চনা করেছেন তিনি- এমন কথা যদি রাজা জানতে পারেন, তাহলে কঠোর দন্ড দেওয়া হবে পূজারীকে।

পূজারী বামুন পূজা না করেই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে গেলেন। শালগ্রাম কলুষিত করার প্রায়শ্চিত্ত একট ব্যায় সাধ্যব্যাপার। গরীব বামুন কোথায় পাবেন অত টাকা? টাকা না হলে কি করে হবে। ব্রাক্ষ্মণকে কাঁদতে দেখে সকলেরই দয়া হল তার উপরে, কিন্তু রাজার কাছে তার হয়ে দুকথা বলবার সাহস কারও হলও না। সকলে গোপালের কাছে যেতে বলল, একটা উপায় গোপাল বের করবেই। শেষে ব্রাক্ষ্মণ কেঁদে কেটে ধরলেন গোপালকে।

রাজার একান্ত প্রিয়পাত্র ওই গোপাল, রাজাকে যদি কিছু বলতে হয়, তবে গোপালকে দিয়ে বলানোই ভাল। গোপাল ছাড়া বামুনের আর কোনও উপায় নাই।

গোপাল বললে, দুচারদিন ধৈর্য্য ধরে থাকুন ঠাকুর মশাই, সুযোগ না এলে কথা কয়ে লাভ হবে না। আমি এর একটা বিহিত করতে পারব আশা করছি। আপনি নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি যান। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। সময় সুযোগ না হলে রাজাকে বলে কিছুই লাভ হবে না। এই বলে গোপাল বামুন ঠাকুরকে বিদায় দিল তখনকার মত।

দুই একদিন পরেই রাজা একদিন ঘোড়ার গাড়িতে বেড়াতে বেরিয়েছেন। গোপালও সঙ্গে আছে। শীতের অপরাহ্ন খানিকটা বৃষ্টিও হয়েছে, গরম শালে সর্বাঙ্গ ঢেকেও তবু রাজ মাঝে মাঝে শীতে কাঁপছেন। এমন সময়ে হঠাৎ গাড়ির ঘোড়াটা মলত্যাগ করলে। অমনি গোপাল হতাশভাবে বলে ফেললে, কি সর্বনাশ।রাজা অবাক হয়ে বললেন, কি সর্বনাশ। গোপাল বললে, সর্বনাশ নয়? এই শীতের সন্ধ্যায় এখন স্মান করে মরতে হবে মহারাজাকেও আমাকেও। গরম মলত্যাগ করে আমাদের অশুচি করে দিলে। এখন কি করা যায় ভেবে দেখুন, মহারাজ।
মহারাজ সবিষ্ময়ে বললেন, ঘোড়া মলত্যাগ করেছে, তাতে আমরা আশুচি হবো কেন, আমি ত কিছু বুঝতে পারছি না। গোপাল তখনই উত্তর দিলে, তাহলে ব্রাক্ষ্মণ মলত্যাগ করাতে নারায়ন অশুচি হলেন কেন? ঘোড়াও যেমন বাহন মাত্র, ব্রাক্ষ্মণও তেমনি দেবতার বাহন ছিল মাত্র। তার কি অপরাধ হল বলুন।

রাজা বুদ্ধিমান ব্যক্তি তিনি এভাবে বিচার করে দেখেননি। গোপালের কথা শুনে তিনি অনেক চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, তুমি যা বললে, সেটা ন্যায়শাস্ত্রের হিসাবে সঙ্গত বটে, কিন্তু হিন্দুর ধর্ম সংষ্কার অনুযায়ী সঙ্গত নয়। মানুষে আর পশুতে সব বিষয়েরইপার্থক্য আছে। যাই হোক ব্রাক্ষ্মণ যে বাধ্য হয়েই এ রকম অবস্থায় মলত্যাগ করেছিল, তা আমি বুঝতে পারছি। প্রায়শ্চিত্ত তাকে করতে হবেই, তবে তার ব্যয় আমি দেবো। তুমি তাকে কালই প্রায়শ্চিত্ত করে আবার যথারীতি পূজা করতে বল। তোমাকে বুদ্ধিতে হারাতে পারব না, তবে নিশ্চয় বামুন ঠাকুর তোমাকে এরজন্য ঘুষ দিয়েছে আমার মনে হচ্ছে।

গোপাল কানে হাত দিয়ে বলে, রাম রাম। এ কথা বলবেন না মহারাজ। ঘুষ কেবল মহারাজের কাছে নিই, তাই বলে গরীব মানুষের কাছে ঘুষ নেব সে মতি যেন কোনদিন না হয় হুজুর। এই বামুন ঠাকুর খুব গরিব কিনা। ভগবান আপনার মঙ্গল করুন।

বিদ্যের জাহাজ

গোপালের সাথে এক ভদ্রলোকের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন রামবাবু, ‘বুঝলে গোপাল, ইনি হলেন শ্রী বিদ্যাচরণ মিশ্র। তোমার মতো অকাট মূর্খ নন, রীতিমত যাকে বলে বিদ্যের জাহাজ!’
‘তা জাহাজই যখন ডাঙায় কেনো? সাগরের জলে ভাসিয়ে দিন না!’ গোপালের সরল উত্তর।

বাঁদরের উৎপাত

গোপালকে বলছেন রামবাবু, ‘এখানে বাঁদরের বড্ড উৎপাত। তোমাকে তো দেখতে বেশ বাঁদরের মতোই! ওদের দলে তোমাকে ছেড়ে দিলে কি হবে বলতো? তুমি নিশ্চই কখনো বাঁদর দেখনি?’
‘আজ্ঞে না! আপনার মত বাঁদর আমি আগে আর কক্ষনো দেখিনি!’ গোপালের সোজা-সাপ্টা উত্তর।

গোপালের জ্যোতিষ চর্চা

গোপালের জ্যোতিষ চর্চার খ্যাতি শুনে দূর গ্রাম থেকে হাত দেখাতে এসেছেন এক ভদ্রলোক।
গোপাল খুব ঘটা করে হাত-টাত দেখে বলে, ‘আপনি তো অতি ভাগ্যবান মশাই! হাতে স্পষ্ট দেখছি আপনার দেহাবসান হবে কাশীতে।’
পূণ্যস্থানে মৃত্যু হবে জেনে ভদ্রলোক খুব খুশি মনে ফিরে গেলেন।
কিছুদিন যেতে না যেতেই ভদ্রলোকের ছেলে এসে উপস্থিত। সে তেড়েফুঁড়ে গোপালকে জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি গননা করে বলেছিলেন বাবার মৃত্যু হবে কাশীতে। কই, উনি তো বাড়িতেই মারা গেলেন?’
গোপাল আমতা আমতা করে বলে, ‘আমি কি তাই বলেছি নাকি? আমি বলতে চেয়েছি উনি কাশতে কাশতে মারা যাবেন। তা সেটা ঠিক বলেছি কি-না? বলুন?’

Gopal Bhar Golpo
Gopal Bhar Golpo

প্রতিযোগীতা

বর্দ্ধমানের রাজসভাতেও এক ভাঁড় ছিল। নাম তার নেপাল। সে সকলের কাছে বলত- গোপালের চাইতে তার বুদ্ধি অনেক বেশি, গোপালকে একবার সামনে পেলে সে তাকে বোকা বানিয়ে দিতে পারে কি না পারে, দেখা যাবে একবার। দৈবক্রমে একসময়ে গোপাল মহারাজের দরবার থেকে বর্দ্ধমান রাজসভায় গিয়ে উপস্থিত।

বর্দ্ধমান রাজ যখন শুনলেন গোপাল এসেছে, তখন তিনি খুশি হয়ে বললেন, তুমি এসেছ, বড় ভাল হয়েছে। আমার ভাঁড়টি সর্বদাই তোমার সঙ্গে প্রতিযোগীতা করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকে। এবার প্রমাণ হবে- সে বড়, না তুমি বড়। প্রতিযোগীতায় তুমি আমার-ভাঁড়কে হারাকে পারলে আশাতীত পুরষ্কার পাবে। নেপালের সঙ্গে এটে উঠতে পার কিনা দেখি। সে জিতলে সেও পাবে।
গোপাল ঈষৎ হেসে বললে, হুকুম করুন, কি করতে হবে।

রাজা বিচারের ভার দিলেন মহামন্ত্রীর উপর। বিজ্ঞ মহামন্ত্রী গোপাল এবং বর্দ্ধমানের ভাঁড় নেপাল দুজনকে ডেকে বললেন, তোমরা প্রত্যেকেই তিনজন করে লোক সংগ্রহ করবে ও তাদের কাল সকালে রাজসভায় হাজির করবে। ওই তিনজনের ভিতর একজন হবে দরিয়ার এ পারের লোক, একজন ওপারের , আর একজন মাঝ দরিয়ার লোক।

যে আজ্ঞে। বলে গোপাল এবং বর্দ্ধমানের ভাঁড় নেপাল দুজনেই বিদায় নিলে।

নেপাল ভাবল এবার আমি গোপালকে ঠকাবই ঠকাব, সে মুচকি হেসে নাচতে নাচতে বিদায় নিল। নেপাল পরদিন ভোরে নদির ঘাটে গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে নদির এপার থেকে একজন, নদির ওপার থেকে একজন এবং মাঝনদীর নৌকার উপরে থেকে একজন লোককে ডেকে আনলে রাজার নাম করে এবং তাদের সভায় এনে হাজির করলে। তিনজন লোকত ভয়ে অস্থির। আমরা কোন দোষ করিনি বাবু, আমাদের কেন রাজসভায় নিয়ে এলেন। আমাদের কি দোষ ধরে নিয়ে এলো?

গোপালও যথাসময়ে রাজসভায় এসে হাজির হলো, তারও সঙ্গে তিনজন লোক, একজন তার ভিতর ভটচাজ ঠাকুর, একজন সন্ন্যাসী, একজন নারী। তাদের নিয়ে সে সভার একপাশে চুপ করে বসে রইল।

বর্দ্ধমানের ভাঁড় রাজা ও মন্ত্রীকে সন্বোধন করে বললে, হুকুমমত আমি এই তিনজন লোককে এনে হাজির করেছি। প্রথম লোকটি ছিল নদীর এপারে, দ্বিতীয় লোকটি ছিল নদীর ওপারে, এই তৃতীয় লোকটি মাঝ নদীতে নৌকার ওপরে ছিল। যদি বিশ্বাস না হয় এদেরকে জিজ্ঞসা করে দেখুন আমি সত্যি বলছি, না মিথ্যা বলছি ওরাই সে কথা বলবে।

তারপর গোপালকে বলা হল, সে যাদের এনেছে তাদেরকে সামনে উপস্থিত করার জন্য। গোপাল জানাল এদেরকে বহুকষ্টে অনুনয় বিনয় করে রাজসভায় উপস্থিত সে করেছে। কেউই প্রথমে রাজসভায় আসতে চায়নি। বিশেষ করে সন্ন্যাসী ঠাকুর কোনমতেই রাজসভায় আসতে নারাজ গোপালের কথাবর্তায় সন্তুষ্ট হয়ে উনি রাজি হয়েছেন। পরিচয় দেবার জন্যে গোপাল করষোড়ে নিবেদন করলেন, মহান মহারাজ। মহামান্য মহামন্ত্রী এবং সভাসদগণ।

এই যে তিনজনকে আমি রাজসভায় নিয়ে এসেছি, এরা কেউ আজ দরিয়া বা নদীর দিকে যান নি। কারণ আমার মনে হয়নি যে সুবিজ্ঞ মহামন্ত্রী দরিয়া বা নদী অর্থে বলতে সামনের গঙ্গানদী বুঝিয়েছেন। আমি অন্তত মহামন্ত্রীর নদি অর্থে এখানে বুঝেছি-ভব নদি। আমার অনুমান অভ্রান্ত মনে করে তাই এপার ওপার ও মধ্যস্থানের এক একটি লোক এনে রাজসভায় বহুকষ্টে হাজির করেছি….

এই যে ভট্চাজ্ ঠাকুর ইনি চাইছেন কি করে দেশে এর পান্ডিত্যের খ্যাতি দিনদিন ছড়িয়ে পড়বে, কি করে বেশ দুপয়সা উপার্জ্জন হবে, কি করে যশে মানে ধনে ইনি দেশও দশের ভিতরে একজন মহামান্য হয়ে উঠতে পারবেন। সম্পূর্ণভাবে ইহকাল নিয়েই ইনি ব্যস্ত আছেন। এক কথায় বলা যায় ইনি এ পারের লোক। এ পারের লোক এ ধরণের ছাড়া আমার অন্য কাউকে মনে হয় না। ….. আর এই যে সন্ন্যাসী ঠাকুর, ইনি ইহকাল নিয়ে মাথা ঘামান না মোটেই। সর্বদাই ভগবানের ধ্যানে-বিভোর কি করে ভগবান দর্শন করবেন সেই নিয়ে তন্ময়, খেতে দিন খাবে খেতে না দিন খাবে না, সুতরাং এদেরকেই বলা যায়, ও পারের লোক। ….

আর এই যে, তৃতীয়টি, ও হল এই নগরের একটি বেশ্যা। বেশ্যা হইকালের কথাও ভাবে না, পরকালের কথাও ভাবে না। সে ইহকাল-পরকাল বলতে কিছুই বোঝে না। সে এপারের লোকও নয়, ওপারের লোকও নয়। অর্থাৎ সে মাঝ নদির লোক। এই আমার তিনজন লোকের পরিচয়। মহামন্ত্রীর আদেশমত কাজ করতে পেরেছি কিনা, এইবার সভাতা যাচাই করুন। আমার আর এর বেশি কিছুই বলার নেই। আপনারা সকলেই ভেবে বিচার করে দেখুন। ঠিক হয়েছে কিনা। সেটা আপনাদের উপর ছেড়ে দিলাম।

সভায় ধন্য ধন্য রব উঠল। রাজা মহামন্ত্রী বললেন, গোপালের মত বুদ্ধিমান লোক ভাড়েদের ভেতর দূরের কথা বড় বড় পন্ডিত সমাজে দুর্লভ। নেপালেরও অহঙ্কার সেদিন থেকে দূরে গেল। রাজা এবার গোপালকে প্রচুর পুরষ্কার সহ বিদায় দিলেন। গোপাল শুধু সুরদিক ভাঁড় নয় শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মহাপন্ডিতও বটে- দিকে দিকে তার এই গুনের কাহিনী ঘোষিত হল। কৃষ্ণনগরে মহারাজ ও গোপালের এই কাহিনীগুলোর গুনের কদর করতে ভুললেন না। সেদিন থেকে নেপাল গোপালের বন্ধু হয়ে গেল।

তুমি চুরি করেছ

একদিন রাজবাড়ির লোক গোপালকে চুরির দায়ে ফেলার জন্য জোর চেষ্টা করেছিল এবং গোপালকে ধরে এনে, হাকিমের সুমুখে খাড়া করে দিল। হাকিম জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি চুরি করেছ?
গোপাল বললে, কেন মিছে কথা বাড়ান। করেছি কিনা সেইটিই তো বিচার করে প্রমাণ করবার ভার আপনার উপরে।

ধনী হবার সহজ উপায়

গোপালের বুদ্ধি প্রখর। একবাক্যে সকলে তা স্বীকার করত। তারজন্য গোপালের সঙ্গে নানান ধরনের লোক প্রায়ই দেখা করতে আসত।

একবার এক ভদ্রলোক এসে গোপালকে জিজ্ঞেস করল গোপাল, তোমার তো এত বুদ্ধি। তোমার বুদ্ধির জোরে আমাকে বিনা পুজিতে ধনী হবার সহজ উপায় বাৎলে দিত পার?

গোপাল হেসে বলেনে, ধনী হবার সহজ উপায় বাতলে দিতে পারি, ফি বার করুন দশ টাকা। আপনিও এরপর এইভাবে দেশবিদেশে, প্রতিবেশীদের কাছে চাউর কেরে দিন যে অল্প অল্প দক্ষিণায় ধনী বানানোর মন্ত্র আপনি জানেন। লোকের ভিড় আপনার কাছে ভেঙ্গে পড়বে।

শর্ট-কাটে ধনী কে না হতে চায় বেকুব ছাড়া? আপনি সকলের কাছ থেকে এইভাবে ধনী বাননোর ফরমুলা বাতলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যদি দশটা করে টাকাও আদায় করতে পারেন তাহলে আপনি বিনা পুজিতে অতি সহজেই ধনী হয়ে যাবেন। ধনী হবার সহজ উপায় আপনি আর পাবেন না। বিশ্বাস না হয় পরীক্ষা করেই দেখুন না, মিথ্যে বলছি কি সত্যি বলছি। এই বলে গোপাল মুচকি মুচকি হাসতে লাগল।

বিনি পয়সায় মেলা

একবার গোপাল আহ্লাদ পুরে বেড়াতে এসেছিল। নতুন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এক অজানা দেবস্থানে উপস্থিত। সেদিন ছিল উৎসব তিথি। সামনে বিরাট আটচালা সাজানো। মধুর বাজনা বাজছে, গানও শোনা যাচ্ছে। পেছনে মন্দির দেখা যাচ্ছে না সামনে থেকে। ভদ্রমহিলা ও ভদ্রলোকরা প্রবেশ করছেন ভিড় করে দলে দলে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে গোপাল তাকিয়ে আছে সেইদিকে। তার বড় ইচ্ছে, সেও একবার ভিতরে গিয়ে দেখে, কি জাতীয় তামাসা ওখানে হচ্ছে।

ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সে দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলে, এখানকার টিকিটের দাম কত ভাই?
দারোয়ান বললে, সে কি? এখানে তো কোন টিকিট লাগে না! বিনি পয়সায় মেলা দেখা যায়।
গোপাল যেন অকূলে কূল পেয়েছে — এইভাবে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল তাই, বলো। ভেট লাগে না বলেই এত ভিড়। এই বলে গোপালও ঢুকে পড়ল ভিড়ের মাঝে আনন্দের লোভে।

বিশুদ্ধ নবগ্রহ সিদ্ধ পঞ্জিকা

শ্রী গোপাল উবাচ- উদ্ভটচন্দ্র জ্যোতিষ রন্তা শাস্ত্রীজী নববর্ষের যে বিশুদ্ধ নবগ্রহ সিদ্ধ পঞ্জিকা প্রকাশ করেছেন, তার গোড়ার পর্বে দেশগত বর্ষফল এইভাবে গুঞ্জিত-
১. দেশের অবস্থা রকম ফেরে মন্দই যাবে না। কেউ খেতে পাবে কেউ পাবে না, কেউ চাকরিতে বহাল হবে, কেউ আবার বরখাস্তও হতে পারে।
২. গঙ্গার জলে ইলিশ কিছু পড়বে। আগের বারের চেয়ে কম হওয়ারই সম্ভাবনা। তবে কিছু বেশি হলেও অবাক হবার কিছু নেই, কারণ কতকগুলি শুভগ্রহেরও যোগাযোগ আছে। (কালির প্রভাবে পুকুরের ইলিশও স্থানবিশেষে বেশ মিলতে পারে।)
৩. বর্তমান গবুচন্দ্রের গৌরী সেন সরকারই টিকে থাকবেন, যদি না অসাধারণ কোন কোপ গ্রহ সন্নিবেশে আচমকা ওলোট পালোট না হয়ে যায়। আর বর্তমান গবু কানুন বহাল থাকলে হবুচন্দ্রই প্রধান অমাত্য থাকবেন, অবশ্য যদি না তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, বা দলের লোক তাকে ঠেঙ্গিয়ে অন্য কোন সরেস হারাচাঁদ বা পাটোয়ারী লালকে দলপতি বলে মনোনীত না করে!
৪. মাঝে মাঝে যান দুর্ঘটনা হবে, গরুর গাড়ি চাপা বা মানুষ চাপা পড়েও কিছু কিছু লোক মারা যেতে পারে!

বৃষ দোহন

কোনও একবদমাইস লোকের প্ররোচনায় মহারাজ একদিন গোপালকে আদেশ দিলেন, একটা বৃষ দোহন করে, তার দুধ আমায় কাল এনে দাও। গোপাল যত বলে যে, বৃষ দোহন করে দুধ পাওয়া যেতে পারে না, মহারাজ সে কথায় কান দিলেন না মোটেই। অগত্যা গোপালকে বেরুতে হল।

গোপালের মত ধুরন্ধর লোক টো টো করে ঘুরে কোন উপায় না বের করতে পেরে ক্লান্ত হয়ে বাড়িতে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। মনে মনে ভাবতে থাকে, কি করে এ যাত্রা বাঁচা যায়। গোপাল কোনও বুদ্ধিই মাথায় খাটাতে পারল না।

গোপালের স্ত্রী স্বামীর এই রকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে বিষ্মিত হয়ে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে। গোপাল বলে, মহারাজ আমাকে বৃষ দোহন করে দুধনিয়ে যেতে আদেশ দিয়েছেন। কি যে করি। কোথায় যাই, কে আমাকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করবে ভেবেই কুলকিনারা কোনও পাচ্ছি না। যদি ষাঁড়ের দুধ দিতে না পারি গর্দান যাবে। নিশ্ছয়ই মহারাজ কারো প্ররোচনায় এমন অসম্ভব কাজ আমার ঘাড়ে চাপিয়েছেন। এখন কি করে রেহাই পাওয়া যাবে ভেবে স্থির করতে পারছি না।

গোপালের স্ত্রী স্বামীকে বললে, তুমি কাল আর বেরিয়োনা। যা করবার আমি করছি। এই সামান্য কাজের জন্য এত চিন্তা। গোপালের স্ত্রী গোপালের চেয়েও সরেস বুদ্ধি ধরে কখনও কখনও। পরদিন খুব ভোরবেলাতেই রাজবাড়ির সম্মূখে নদীর ঘাটে গিয়ে গোপালের স্ত্রী গাদা গাদা কাপড় সশব্দে কাচতে লাগলে।

ওইখানটিতে মহারাজ রোজ সকালে ভ্রমণ করেন। তিনি কাপড় কাচার শব্দ শুনে ভাবলেন এ সময় এখানে কিসের শব্দ? কাছে এসে দেখলেন, এক পরমা লাবণ্যবতী মহিলা ধোপানীর মত কাপড় কাচতে ব্যস্ত। দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ দেখলেন, আকৃতি দেখেই বুঝতে পারলেন এ নারী কোনো বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন বংশের মহিলা। তিনি সবিস্ময়ে বললেন, ভদ্রে! এই কঠোর শ্রমের কাজ দাসীতেই করে। আপনি নিজে এই কাজ করছেন কেন? এর কারণ জানতে আমার একান্ত ইচ্ছে করছে, যদি বলেন খুবই আনন্দিত হব।

গোপাল মহিষী বললেন, কি করবো বলুন বাবা দাসীর অসুখ করেছে। অথচ নতুন দাসী খুঁজে আনবার সামর্থ আমার স্বামীর আজ আপাততঃ নেই। কারণ, তিনি প্রসব বেদনায় একান্ত কাতর। কাপড় সিদ্ধ হয়ে গেছে, কাজেই নিজে কাপড় কাচা ছাড়া আর উপায় কি? ঘরে আর কেউ নেই যে কাজটুকু করে দেয়। ২/১ দিন ভেজা কাপড় ফেলে রাখাও যায় না নষ্ট হয়ে যাবে।

মহারাজ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, স্বামী প্রসব-বেদনায় কাতর? একি অসম্ভব কথা বলছেন আপনি? পুরুষেরা কি সন্তান প্রসব করতে পারে? এ আমি আপনারমুখে ছাড়া কোথাও কোনওদিন দেখা দুরের কথা শুনিনি।

গোপালের স্ত্রী বললেন, কেন হবে না? যে দেশে বৃষ দোহন করলে দুধ পাওয়া যায় সে দেশে পুরুষের পক্ষে সন্তান প্রসব করা কি এতই অসম্ভব। আজ শুনলাম আমাদের মাননীয় মহারাজ আদেশ দিয়েছেন একজনকে বৃষ দোহন করে দুধ আনতে-
মহারাজ নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং অনুমান করলেন ইনি গোপালের স্ত্রী। তখন নিজে গোপালের বাড়ি গিয়ে গোপালকে ডেকে, প্রাসাদে নিয়ে গেলেন। এবং সুকৌশলে এই ভুল ভাঙানোর জন্য গোপালের স্ত্রীকে বেশ ভালভাবেই পুরষ্কৃত করলেন এবং যার প্ররোচনার তিনি গোপালকে এই কাজের জন্য বিড়ম্বিত করেছিলেন, তাকেও প্রচুর জরিমানা করেন।

গৌরী সেন

গোপাল এক মুদি দোকান থেকে ধারে প্রায়ই মাল নিত, কিন্তু টাকা শোধ করতে চাইত না। লোকটি খুব সরল প্রকৃতির ছিল। গোপাল রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পেয়ারের লোক বলে দোকানি ও টাকা চাইতে সাহস পেত না যদি রাজ রাগ করেন তাহলে গেছি।

একদিন দোকানির ভীষণ টাকার দরকার, বাড়িতে অসুখ! গোপাল মাল নিতে এলে দোকানি বললে, ধারে তো রোজই মাল নিয়ে যাচ্ছেন, টাকাটা আমার আজ দরকার আছে, দেবেন?

দোকানির কথা শুনে গোপাল মুচকি হেসে বললে, আপনার কাজ মাল দেওয়া-দিয়ে যান, আমার কাজ মাল নেওয়া-টাকা যে দেবার সেই দেবে ভাই!

দোকানি বলল, সেকথা বললে কি চলে দাদা? টাকা কে দেবে তাই বলে মাল নিলে ভাল হয়। আমাকে আর ভাবতে হয় না।
গোপাল তখন মাথা চুলকে বললে, টাকা আবার দেবে কে? টাকা দেবে গৌরী সেন।

গৌরী সেনের নাম দোকানি কখনও শোনেনি, সে তাই বললে তিনি আবার কে? দোকানী মনে করল হয়ত গৌরীসেন মহারাজের কোষাগারের কোনও লোক বা কেউ কেটা।

গোপাল বলল, তাজ্জাব ব্যাপার! সবাই যাকে চেনে, তুমি তাকে চেনো না? মালটা দিয়ে দাও। তো বাপু তারপর যাকে জিজ্ঞাস করবে, সেই তোমায় গৌরী সেনের ঠিকানা বাতলে দেবে। তার কাছে দিয়ে আমার নাম বললেই টাকা সঙ্গে সঙ্গেই পাবে।
দোকানী গৌরী সেনের মত লোকের কথা না জানার জন্য লজ্জা পেল ও ঝটপট যা যা মাল বলল সে মাল দিল।

গোপালের পায়ে ফোঁড়া

গোপালের একবার পায়ে ফোঁড়া হয়েছিল। সেজন্য গোপাল খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে রাজসভায় ঢুকতেই মহারাজ বললেন, গোপাল, কখন যে তুমি পরের বাগানে ঢুকে চুরি করতে দিয়ে ঠ্যাঙ ভাঙলে, আমি মোটেই টের পেলুম না।

গোপাল মুচকি হেসে বললে, হুজুর আপনিও আমার সঙ্গে সেই পেয়ারা বাগানে ঢুকেছিলেন। কিন্তু আপনি গাছে ওঠেননি বলে মোটেই টের পাননি। আপনি তখন তলায় পেয়ারা গুনছিলেন। আপনি অগুনতি পেয়ারা দেখে মশগুল ছিলেন গোনায়-এজন্য আমি যে পড়ে দিয়ে ঠ্যাং ভাঙলুম তা দেখতে পাননি, আপনি টের পেলেরন আজ। হুস থাকলে ত দেখবেন।

সুদ ছাড়তে দিয়ে ব্যবসা কখনো মাটি দেব না

গোপাল ভাঁড় একদা খেয়া নৌকা করে পারে আসছিল। তোড়ে জোয়ার আসার সময় গোপাল খেয়া নৌকা থেকে জলে পড়ে গেল মাঝনদীতে। পড়েই নাকানি চোবানি খেতে লাগল। ভীষণ স্রোত, তাই কেউ তাকে তোলবার জন্যে, জলে ঝাঁপ দিতে সাহস করল না। একখানা ডিঙ্গি আসছিল পাল তুলে, তা থেকে মদন মাঝি, দেখতে পেয়ে লাফ দেয় পড়ে গোপালকে টেনে তুলল তার ডিঙ্গিতে।
আগে চিনতে পারেনি, এখন দেখলে, তার মহাজন গোপাল ভাঁড়কে সে বাঁচিয়েছে। গোপালের কাছে মদন মাঝি কিছু টাকা দেনা করেছিল। আশা হলো, তাহলে দলিলখানা হয়তো গোপাল অমনি অমনি ফেরত দিতে পারে। মদন মাঝি এই আশায়ই মনে মনে ফাঁদছিল।

কিন্তু গোপালের প্রথম কথাতেই সে নিরাশ হলো। গোপাল বলল, তুমি আমায় বাঁচিয়েছো মদন। আমিও দরকার হলে তোমার জন্য প্রাণ দেব। কিন্তু তা বলে সুদ ছাড়তে দিয়ে ব্যবসা কখনো মাটি দেব না।

গোপালের প্রাঞ্জল কথা শুনেই মদন সরকারের প্রাণ জল, তার আশার গুড়েবালি। হায়রে! আসল ছাড় তো দুরস্থান সুদের ঠ্যালাতেই মদনের লবেজান। পরে গোপাল তার দলিল ফেরৎ দিয়েছিল।

গোপালের বিয়ে

গোপালের সবেমাত্র বিয়ে হয়েছে। এক বাদলার দিনে স্ত্রীকে দেখবার জন্যে তার মন ছটফট করে উঠলো। নতুন বৌ তখন পিত্রালয়ে, শ্বশুরবাড়িও প্রায় দুক্রোশের উপর। গোপাল ওই বাদলাতেই দুই ক্রোশ পথ ভেঙ্গে সন্ধ্যা নাগাদ শ্বশুরবাড়ীতে পৌছাল।
জামাইকে পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে খুব ধুমধাম। সেকালে রসিকতার ক্ষেত্রে পাত্রপাত্রী বাছ বিচার বড় একটা ছিল না। শ্বশুর-জামাই, শাশুড়ী-পুত্রবধুতেই মোটা রসিকতার আদান প্রদান অবাধেই চলতো। বাদলার দিনে হঠাৎ গোপালকে দেখে গোপালের শ্বশুর খুব খুশি হল। তাই সে একটা রসিকতার প্রলোভন সংবরণ করতে পারলে না। সকলের সামনেই জিজ্ঞাসা করলে, আজকের মতন বাদলায় কি ভাল লাগে, বলো দিখে কে বলতো পারো? যেবলবে তাকে ৫০ টাকা পুরষ্কার দেবো।

গোপালের শ্বশুরের অবস্থা বেশ ভালই। গোপাল মুখফোঁড় লোক বলে উঠল আজকের মত বাদলায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বৌয়ের সঙ্গে হাসি আর গল্প করতেই ভালো লাগে। এর চেয়ে আর কি ভাল লাগতে পারে।

ঠিক এই কথাটিই শোনবার প্রত্যাশা করছিল শ্বশুর। কিন্তু সে অমনি বলে উঠল, কথাটা ঠিক, কিন্তু তার চাইতেও ভালো লাগে বেয়াই বাড়ি দিয়ে বেয়ানের সঙ্গে গল্প করতে। বল-বাবাজী তোমার চেয়েও এটা আরও বেশ ভাল নয় কি?

গোপাল অমনি দাঁড়িয়ে চাদর কাঁদে তুললে, বললে, তাই না কি? তা জানলে তো আমি না এসে, বাবাকে পাঠিয়ে দিতাম। তা এখনও রাত বেশি হয়নি, আমি গিয়ে বাবাকে এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি। তিনি এসে বেয়ানের সঙ্গে গল্প গুজব আমোগ আহ্লাদ করুন। আমি যত তাড়াতাড়ি পারব ছুটতে ছুটতে বাড়ি যাব।

শ্বশুরের মুখ ভোতা। দেতো হাসি বের করে বলে। তোমার এখন বৃষ্টির রাতে যেতে হবেনা বাবা। ভিতরে গিয়ে বিশ্রাম কর। গোপাল মুচকি মুচকি হাসতে থাকে, বৌ এর দিকে তাকিয়ে মনের মত কথার জন্য মন বেশ খুশী।

গোপালের মেয়ে জামাই

গোপালের স্ত্রী সব সময় বায়না ধরত–মেয়ে জামাইকে আনবার জন্য। একদিন স্ত্রী জিদ ধরল ওদিকে যাচ্ছে যখন, মেয়ে জামাইকে নিয়ে এসো। সবাই কেমন সাধ আহ্লাদ করে। কিন্তু আমরা এসব করতে পারি না।

স্ত্রীর কথা শুনে গোপাল ভাবল, জামাইরা যত বাড়িতে না আসে ততই ভালো। জামাই আনা মানেই হাতির খরচ। আর বাবাজী একবার এলে হঠাৎ বিদায় হয় না। মুখে বলল, এই তো মেয়ে জামাই ছমাস আগে এসে ঘুরে গেল। এর মধ্যে আবার আসবে কি? এলেই দুমাসের ধাক্কা। আমার এখন অবস্থা খুব খারাপ। টাকা রোজগার ভাল যাচ্ছে না। মেয়ে জামাই এলে সংসারের ধাক্কা সামলাব কি করে? এখন থাক, ২/১ মাস পরে আসবে।

গোপালের স্ত্রী রেগে বলল, তুমি কি হাড় কেপ্পন গো। এমন শ্বশুর যেন কারও না হয়। ভগবানের করুনায় আর মহারাজের কৃপায় তোমার কিসের অভাব? গোপালের স্ত্রীর নানা কথা বলে ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলে। তাই বাধ্য হয়ে গোপাল লোক পাঠাল মেয়ে আর জামাইকে নিয়ে আসার জন্য।

মেয়ে জামাই ঠিক সময়ে এলো। কিন্তু জামাই শ্বশুরবাড়িতে রোজ চব্যচোষ্য লেহ্য পেয় আদরে পেয়ে আর যাওয়ার নামটি করে না একেবারেই। জামাই যেতে চাইলেও গোপালের স্ত্রী ছাড়তে চায় না কিছুতেই। এই তো এলে বাবা। এখনই যাই যাই করছ কেন? দুমাসের আগে তোমাদের কিছুতেই ছাড়ব না এবার। তোমার বাড়িতে কী দরকার যে বাড়ি না গেলে চলবে না, এখন যাওয়া চলবে না।

এদিকে খরচের বহর দেখে গোপাল রোজই চোখে সর্ষে ফুল দেখতে লাগল। অবশেষে গোপাল ভেবে চিন্তে একটা বেশ মনের মত উপায় আবিষ্কার করে ফেলল মনে মনে। গোপাল একদিন বিকেলবেলা জামাইকে একান্তে ডেকে বলল, বাবাজী, এখানে বড় ছিঁচকে চোরের উৎপাত। ছিঁচকে চোরের জ্বালায় গাছে লেবু রাখা দা। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যের সময় ব্যাটা চোর এসে লেবু তুলে নিয়ে যায়। আমি সাবধান হয়েও চোরকে আজ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। যদি বা ধরা যেত- আমি আবার সব সময় বাড়িতে থাকি না কি করে চোর ধরব তুমি সব সময় বাড়িতে থাক দেখ যদি চোর ধরতে পার কিনা। তুমি বাবজী, সন্ধ্যের পর বৈঠকখানা ঘরে বসে-লেবুগাছের দিকে একটু নজর রেখো তো। চোরকে ধরলে একেবারে জাটটে ধরবে। লেবু চোর ব্যাটাকে শায়েস্তা না করলে চলছে না। আজকাল লেবুর যা বাজার। বাজারে লেবু পাওয়াই যায় না। এক একটা লেবুর দাম অনেক।

শ্বশুরের কথা শুনে বলে, আপনি কিছু ভাববেন না বাবা। আমার নজর এড়িয়ে চোর কিছুতেই লেবু চুরি করতে পারবে না। চোর তো সামান্য লেবু চুরি করতে আর মাঝ রাতে আসবে না, সন্ধ্যের ঠিক পরেই আসবে। ব্যাটাকে একদিন না একদিন আমি ঠিক ধরে ফেলবো। লেবু-চুরির কথা এর আগে বলেননি কেন আপনি? আমি প্রায় এক মাস এলাম আপনার বাড়ীতে।

সেদিন সন্ধ্যের সময় গোপাল বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে, চুপি চুপি বললে, যাও তো, লেবু গাছ থেকে চট করে একটা লেবু নিয়ে এসো তো। লেবু এনে আমায় সরবৎ করে দাও। আমাকে এখনি একবার রাজবাড়িতে যেতে হবে, যদি কিছু টাকা পয়সা রোজগার করতে পারি। হাত একেবারে খালি।

সেদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। ছেলেমেয়েরা বেড়াতে গেছে। কোন লোক না থাকায় গোপালের স্ত্রী অন্ধকারে নিজেই লেবু আনতে গেল। ছেলেমেয়েদের গোপাল কায়দা করেই আগে থেকে বেড়াতে পাঠিয়ে দিয়েছিল যাতে, জামাই ছাড়া বাড়িতে আর কেউ না থাকে। কেউ উপস্থিত থাকলে কাজ হবে না। জামাই শ্বশুরের কথা মত ওঁৎ পেতে বসে ছিল। যেমনি গোপালের বৌ লেবু পাড়তে ঢুকেছে অমনি জামাই অন্ধকারে চোর ভেবে শ্বাশুড়ীকে জাপ্টে ধরল কষে। এমন জাপ্টে ধরল যে শাশুড়ী কোনও মতে পালিয়ে যেতে পারল না। টানা হ্যাঁচড়া করতে করতে জামাই চেঁচাল আজ তোর লেবু-চুরি করা বের করছি। তুমি ভারি ঘুঘু-না। রোজ রোজ লেবু চুরি করার মজা তোমায় দেখাচ্ছি। তুমি মনে করেছ, কেউ বাড়িতে নেই?

গোপাল এই অবস্থার জন্য তৈরিই ছিল। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে তাড়াতাড়ি ঘরের হ্যারিকেনটা নিয়ে ছুটে গেল। গিয়ে দেখল জামাই বাবাজী তখনো শাশুড়ীকে কষে জাপ্টে ধরে রয়েছে। শাশুড়ী প্রাণপণে জামাইয়ের হাত থেকে রেহাই পাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না দু-জনের মধ্যে ঝাপটা ঝাপটি হচ্ছে। তাই দেখে গোপাল বললে, তাইতো বলি- জামাই আনার এত শখ কেন? এবার বুঝতে বাকি নেই।

এই ঘটনায় শাশুড়ীও যেমন লজ্জা পেল, জামাই ও তেমনি লজ্জা পেল। তারপরদিন জামাই লজ্জায় সেই যে মেয়েকে নিয়ে চলে গেল-তারপর আর শশুরবাড়ি এল না। গোপালের স্ত্রীও মেয়ে জামাইকে আনার কথা আর মুখ ফুটে গোপালের কাছে কোনওদিন উন্থাপন করতে পারল না। গোপাল সকলের মেয়ে জামাই এলে কেবল মুচকি মুচকি হাসে আর তাকে স্ত্রীকে দেখে।

গঙ্গা পার

একদিন গোপাল ও কয়েকজন লোক গঙ্গা পার হচ্ছিল। সকলের কাছে বেশি মাল থাকায় নৌকাটি প্রায় জলসই হয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে কত হয়ে নৌকায় জল ঢুকছিল। লোকও বেশি হয়েছিল মাছও ছিল সেই নৌকায় প্রচুর। তাই দেখে একজন যাত্রী তার বড় মোটটা মাথায় তুলে সোজা হয়ে দাড়াল। গোপাল জিজ্ঞাসা করল সে মাথার ওপর মাল তুলে দাঁড়িয়েছে কেন?

সে বলল–তাহলে নৌকাটি ঢুবে যাবে না। সকলে নৌকা থেকে মোট মাথায় তুলে ধরলে নৌকাটার ওজন কমে যাবে আর জলডুবি থেকে নৌকোর সঙ্গে আমাদের জান আর সম্মান বাঁচবে। আমি কি কম বুদ্ধিমান।
গোপাল লোকটির বুদ্ধির বহর দেখে না হেসে পারল না এই আহম্মক লোকটার কথা শুনে।

ডবল চাকরির ঝামেলা

একদিন এক জরুরী কাজের জন্য রাজা গোপালকে ডেকে পাঠালেন। গোপাল বাড়ি ছিল না সে বাজার করতে গিয়েছিল। বাজার থেকে এসে শুনতে পেল রাজবাড়িতে রাজার হুকুম যে ঠিক সময়ে সভায় হাজির হওয়ার জন্য। রাজা ওদিকে গোপালের দেরি দেখে রেগে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন।

গোপাল আসা মাত্রই চড়া গলায় বললেন, আমার হুকুম পেয়ও তুমি আসতে দেরি করো, আমায় তুমি অমান্য করতে শুরু করেছো তাহলে? আমার আর তোমাকে প্রয়োজন নাই।

গোপাল করজোড়ে বললে, সে কি সর্বনাশে কথা প্রভু? আপনাকে অমান্য করবো, আপনার দাসানুদাস হয়ে? ব্যাপার কি জানেন আমি চাকুরি করি দুটো। একটা হল রাজার আর একটা বৌয়ের। বৌয়ের বাজার না করলে রেগে ঢোল, আর তাহলেই রাজার বয়স্যগিরিতে গোল হয়ে যায়। যদি বৌকে আপনি মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে দেশ থেকে বার করে দিতে পারেন, দিন মহারাজ! তা হলে ডবল চাকরির ঝামেলা আর ধকল থেকে রেহাই পেয়ে আমি একমনে রাজসেবায় আত্ননিয়োগ করতে পারি। এ ছাড়া আমার কোনও উপায় নেই মহারাজ।

গোপালের কথার ঢং দেখে রাজার রাগ উবে গেল। তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন। সভায় আর সকলে মহারাজের হাসিতে যোগ দিতে ভুল করল না।

গোপাল ও মিষ্টির দোকান

একদিন গোপাল ও তার বন্ধু রাস্তা দিয়ে ভিন গাঁয়ে যাচ্ছিল। যেতে যেতে দেখতে পেল একটা মিষ্টির দোকানে থালায় থালায় থরে থরে মিষ্টি সাজানো আছে। মিষ্টি দেখেই দুজনের জিভে জল এসে গেল। দুজন পকেট হাতড়িয়ে দেখে মিষ্টি খাবার মত পয়সা পকেটে নেই। কিন্তু মিষ্টি না চেখে চলে যেতে তাদের পা উঠছেনা। তার দুজনেই লোভ সামলাতে পারলে না। সঙ্গে পয়সা না থাকলেও গোপাল ও গোপালের বন্ধু পোশাক পরিচ্ছদের দিক থেকে বেশ পরিপাটিই ছিল। দেখে বেশ বনেদী পয়সাওয়ালা ঘরের মনে হচ্ছিল।

তখন ভর দুপুর। দোকানী ছাড়া আর কেউ ছিল না। গোপাল আর গোপালের বন্ধু আগে থেকে মতলব এটে নিয়ে দোকানে ঢুক পড়ল। দু’জনেই বেশ পেটপুরে যা ইচ্ছে সব রকম মিষ্টিই খেয়ে নিল । জাঁদরেল খদ্দের ভেবে দোকানদার একটু একটু করে কৃতার্থের হাসি হাসে।

দোকানদার যখন দাম চাইলে, তখন গোপাল বললে, আমি দিচ্ছি। কত দাম হয়েছে তোমার? গোপালের বন্ধুটি বললে, না, আমি দিচ্ছি, কত দাম বল। দুজনের মধ্যে দাম দেওয়া নিয়ে দস্তরমতো রেষারেষি শুরু হয়ে গেল। গোপাল দাম দিতে যায়, তার বন্ধুটি বাধা দেয়। বন্ধুটি দাম দিতে এগোয়, গোপাল বাধা দেয়। না তুমি দেবে না, আমি দেব-এই বলে দুজনের মধ্যে কে আগে দেবে এই মনোভাব যেন। দোকানী এই সব দেখে হেসে লুটোপুটি।

পরিশেষে গোপাল দোকানীকে বললে মশায়, আপনার কাঁধের গামছাখানা দিয়ে আপনার চোখ বেধেঁ দিচ্ছি। আপানি চোখ বাঁধা অবস্থায় আমাদের দুজনের মধ্যে যাকে প্রথমে এসে ধরবেন- সেই খাবারের দাম দেবে। বলুন রাজী আছেন? দোকানী গোপালের প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেল।

গোপাল দোকানীর কাধের গামছাখানা দিয়ে তার চোখ দুটোকে কষে বেধে দিল। তারপর গোপাল আর গোপালের বন্ধু দোকান থেকে তাড়াতাড়ি আরও কিছু মিষ্টি তাদেরই জায়গায় বেধে নিয়ে কেটে পড়ল। দোকানী দুহাতে এদিক ওদিক করে যেতে লাগল।
বেশ কিছুদূর চলে আসার পর গোপালের বন্ধুটি গোপালকে বলল, অনেকদিন পরে বেশ কানামাছি খেললে তো। গোপাল বন্ধুর কথা শুনে মুচকি হেসে বললে আমি আর কানামাছি খেললুম কোথায়? দোকানী ব্যাটা এখনও বোধ হয় খেলছে। তারপর দুজনে হাসতে হাসতে জোরে জোরে পা চালিয়ে পগারপার। যদি পেছনে এসে পড়ে।

গোপাল ও রাজা কৃষ্ণচন্দ্র

একদিন ঘোর বর্ষার সময় গোপাল জুতো হাতে পথ চলেছে। এমন সময় পাল্কী চড়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ওই পথে যাচ্ছিলেন। তিনি গোপালকে দেখে পাল্কী থেকে নেমে এলেন। আর গোপালের জুতোর দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, কি গোপাল! পরকাল যে হাতে করে চলেছো? কী ব্যাপার তোমার?
গোপাল বললে, আমি তবু হাতে রেখেছি, আপনি যে খেয়ে বসে আছেন।
রাজা কৃত্রিম রোষে বললেন, তুমি আমাকে জুতো খোর বলছো? জান এর শাস্তি কি?
গোপাল কিছুমাত্র ভয় না পেয়ে বললে, আজ্ঞে না হুজুর না বললে কি করে জানব। তুব বলি জোয়ান মানুষ আপনি, পাল্কী ছাড়া চলতে পারেন না। এতেও কি আপনি বলতে চান– আপনি নিজের পরকাল খেয়ে বসেননি বা আমি মিথ্যা বলেছি?
মহারাজ এদিকটা চিন্তা করেন নি। যখন ভুল বুঝতে পারলেন তখন না হেসে পারলেন না যে গোপাল ঠিক কথাই বলেছে।

পশার কি রকম হলো

গোপালের বন্ধু গোপালকে জিজ্ঞাসা করে, পশার কি রকম হলো হে? রাজবাড়িতে বেশ কয়েকমাস যাচ্ছ। রোজগার পাতি ভাল হচ্ছে তো?
গোপাল বলল, আশ্চর্য রকম। ছমাসে লক্ষ টাকা রোজগার করেছি।
বন্ধু হকচকিয়ে গেল একেবারে। বলি, বল কি হে? এ যে আশাতীত। লক্ষ টাকা ভাবার বিষয় বটে।
গোপাল বলল, আশাটা অন্যরকম ছিল, স্বীকার করছি। লক্ষ টাকা ব্যাপারটা কি শুনতে চাও? শোন, বন্ধু। প্রথম মাসে মহারাজের কাছে চালাকি করে এক টাকা আদায় করেছিলাম। তারপর এই পাচঁ মাসে শূণ্য পাচিছ। একের পিঠে পাচঁ শূন্য পাচ্ছি। একের পিঠে পাঁচ শূন্য- অর্থাৎ লক্ষ টাকা হলো না? তুমি যদি রোজগার বাড়িয়ে তুলতে চাও আমাকে অনুসরণ করতে পারো।

মহাজনের টাকার থলি

ভদ্রলোক টাকার থলে সহ নৌকা করে নদীর ওপারে যাচ্ছিলেন। মাঝ নদিতে হঠাৎ করে নৌকাটা ডুবে যায়। তীরে গোপাল ও তার বন্ধুবান্ধবরা দাড়িয়ে ছিল তারা অনেক কষ্টে ভদ্রলোককে তীরে টেনে তুলতে সমর্থ হয়। নাহলে স্রোতের টানে তাঁকে অক্কা পেতে হত। কিন্তু মহাজনের ভারি টাকার থলিটি বর্ষার ভরা নদীতে কোথায় তলিয়ে গেল। গোপালরা জানতে পারল না।

ডাঙায় তোলার কিছু পর ভদ্রলোক জ্ঞান ফিরে পেয়ে গোপালদের গালাগাল করতে থাকেন। আমার নদি থেকে না তুলেযদি টাকার থলেটি তুলতে পারতেন তবে বুঝতুম একটা বাহাদুরী কাজ করেছেন। আপনারা সব অকর্মার ঢেকি, একদম অপদার্থ। এরূপ লোকদের দুচোখে দেখতে পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি।

এসব শুনে গোপাল বলে, আপনাকে মানুষ ভেবে জান বাঁচিয়ে মহাদোষ করে ফেলেছি তাই আমরা ঢেকি। যদি আগে জানতাম আপনি অকৃতজ্ঞ জন্তু বিশেষ–যার কাছে জানের আপনি অকৃতজ্ঞ জন্তু বিশেষ–যার কাছে জানের চেয়ে টাকার থলি বড়, তাহলে আপনার ওই মাংসের ঢিবিকে আমরা স্পর্শও করতাম না। আপনি ঢোক ঢোক লোনা জল খেয়ে টাকার টুং টুং শব্দ শুনতে শুনতে ভবপারে যাওয়ার ঢং ঢং বাদ্যি এতক্ষণ শুনতেন। এই বলে সকলে সেখান থেকে রাগ করে চলে গেল।

গোপাল ও পাওনাদার

গোপাল একজন লোকের কাছে কিছু টাকা ধার নিয়েছিল। সেই পাওনাদার গোপালকে পথের মাঝে পাকড়াও করে বললেন দুদিনের মধ্যে টাকা না দিলে আমি তোমার শ্রাদ্ধ করে ছেড়ে দেব বাছাধন। তখন কেমন মজা পাবে দেখবে। পাওনাদারের কথা শুনে গোপাল মুচকি হেসে বলেন, টাকা ধার দিয়ে ফেরত পাচ্ছেন না, উপরন্তু আমার শ্রাদ্ধের খরচও বহন করতে চাইছেন? ওই কাজটা দাদা আমার ছেলেকে করতে দিন। আমার শ্রাদ্ধ করলে আমি কি স্বর্গ থেকে টাকা নিয়ে আশীর্বাদ করতে আসব নাকি বন্ধু! এই বলে মুচকি মুচকি হাসলে লাগলো।

গরীবের ঘোড়া রোগ

মহিমাচরণ নামে এক গরীব প্রতিবেশী একদিন গোপালের কাছে এসে বললেন, বুঝলে ভায়া, একটা মাত্র ছেলে, ছেলেটার ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমি শিউরে উঠি মাঝে মাঝে। ছেলেটা দেখছি আমায় শান্তিতে মরতেও দেবে না। মরে গেলে যে কি করবে কুল কিনারা পাই না। কোনও বুদ্ধি দিতে পারেন এ ব্যাপারে? কেন, কি হয়েছে তার? গরীবের ঘোড়া রোগ হলে যা হয়! খায়-দায় আর সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়ায়। একটুও ভাবনা-চিন্তা নেই-কি করে পরে খাবে পরবে। আমি মরে গেলে সংসারের কি হাল হবে? সে কোন কাজকর্মে মন দিচ্ছে না। তা অত-ভাবনা কিসের? বোঝাই যাচ্ছে আপনার ছেলে গো-বেচারা নয়, তাই রত্নটি ঘোড়া রোগে মারা যাবে না। ওই লায়েক ছেলেকে এক ডাগর মেয়ে দেখে বড় ঘরে বিয়ে দিয়ে বড়লোক করে দিন- ঘোড়া রোগও সেরে যাবে।

গোপালের গুরু

গোপালের একবার একটি গুরু হারিয়ে গিয়েছিল। চৈত্রের কাঠ ফাটা রোদ্দুরে বনবাদাড়ে খুঁজে খুঁজে সে বিকেলে নিজের বাড়ির দাওয়ায় ধপাস করে বসে ছেলেকে ডেকে বললে, ও ভাই, জলাদি এক ঘটি জল আনো, তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে। গোপাল হা-হুতাশ করে বলতে থাকে, ভাইরে! আর বুঝি বাঁচি না। ঘরে গোপালের কোন ভাই থাকত না। একমাত্র ছেলে, বৌনিয়ে গোপালের সংসার। গোপালের স্ত্রী রান্নাঘরে ছিল, সে গোপালের কথা শুনে বললে, মিনসের এতটা বয়েস হলো তবু যদি একটু কান্ডজ্ঞান থাকত! নিজের ছেলেকে ভাই বলে ডাকছে গা! ঘরে ছেলে ছাড়া কি আর কটা ভাই আছে গো তোমার! স্ত্রীর কথা শুনে গোপাল বললে, সাধের গুরু হারালে এমনই হয় মা! স্ত্রী মা ডাক শুনে একহাত জিভ বের করে সেখান থেকে পালিয়ে যেন বাঁচে। এ আবার কি কথা?

গোপালের ভাইপো

গোপালের ভাইপো গোপালের মতোই সেয়ানা। তবে গোপালের মত বুদ্ধি করে এত পয়সা রোজগার করতে পারত না। মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আর্থিক আনুকুল্যে গোপাল পাকাবাড়ি তুলেছিল কিন্তু তার ভাইপোর পক্ষে তখনও পাকাবাড়ি তোলা সম্ভব হয়নি। কুঁড়েঘরেই বাস করতে হতো তাকে। লোক দেখানো বুদ্ধি কম থাকার জন্য পয়সা রোজগার করত কম। গোপাল একদিন তার পাকাবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে গড়গড়া টানতে টানতে তার ভাইপোকে ডাক দিয়ে বলল, ওরে হাবু, এই অসময়ে বাড়ির ভেতর বসে কি করছিস রে? এদিকে আয় আমি ছাদে বসে আছি। তোকে একটা জিনিষ দেখাব।

গোপালের ভাইপো হাবু বাড়ির ভেতরেই ছিল। গোপালের ডাক শুনতে পেয়ও সেদিন বাড়ির বাইরে বেরোয়নি বা গোপালের ডাকে সাড়াও দেয়নি। কারণ সে বুঝতে পেরেছিল যে, তার কাকা তাকে সহসা ডাকে না; নুতন পাকা বাড়ির প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষন করার জন্যই এখন ডাকাডাকি করছে। নইলে যে কাকা সচরাচর কোনও খোঁজ নেয় না, সে কেন দরাজ গলায় ডাকছে এই অসময়ে। গোপাল কাকার খোঁজ নেওয়ার কোন প্রয়োজন ভাইপোর নেই-ভাইপো এই সিদ্ধান্ত মনে মনে নিয়ে নিঃসাড়ে চুপচাপ রইল। গোপালের কথায় কান দিলোনা বা ছাদে গেলও না।

এই ঘটনার প্রায় দুবছর পরে গোপালের ভাইপো নিজের চেষ্টায় পাকাবাড়ি তৈরি করল অনেক কষ্টে টাকা রোজগার করে। তার নতুন পাকাবাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে সে গোপালকে বললে, ও গোপাল কাকা দুবছর আগে ছাদে দাঁড়িয়ে আমায় যেন কি বলেছিলে? তুমি আমার ছাদে এসো বলছি। গোপাল সেদিন বুঝতে পারল যে তার ভাইপো বোকা নয়- তার মতই সেয়ানা হয়েছে দেখছি। নইলে দুবছর পরে কেউ আবার সাড়া দেয়? গোপাল তখন মনে মনে তারিফের হাসি হাসতে লাগল তার ভাইপোও বেশ সেয়ানা হয়েছে দেখে।

গোপাল ভাঁড় এর আলু কেনা

গোপাল একবার হাটে আলু কিনতে গিয়েছিল। পথেই দেখা হল এক বন্ধুর সাথে। রসিক বন্ধুটি গোপালের আলু খরিদ করার কথা শুনে বলল, তুমি যদি আলু বিনি পয়সায় খরিদ করতে পার দশ টাকা পুরষ্কার পাবে। গোপালকে বন্ধুটি রসিকতা করার লোভে একটু উসকে দিল। মনে করেছিল গোপাল পারবে না।

গোপাল বন্ধুকে বললে, ও এই কথা? তুমি আমার সাথে হাটে চল দেখবে, দিব্যি বিনি পয়সায় আলু কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরব। কাউকেও কোনও পয়সা দিব না। তা তুমি সচক্ষে দেখতে পারবে।

হাটে গিয়ে গোপাল প্রত্যেক আলু বিক্রেতাকে জিজ্ঞেস করলে ভাই, আমি যদি তোমার কাছে থেকে পাঁচ সের আলু কিনি, কটা আলু ফাউ দেবে তুমি আমাকে বল? শীতের সময় সেদিন বাজারে আলুর প্রচুর আমদানি। আলুওয়ালারা বললে পাচঁটা করে আলু ফাউ পাবেন পাঁচ সের আলু কিনলে। এর বেশি দিতে পারব না

গোপাল তখন প্রত্যেক আলুওয়ালার ঝুড়ি থেকে পাঁচটা করে আলু তুলে নিয়ে বলল, এই হাটে কেবল ফাউটা নিলাম, সামনের হাটে তোমাদের সকলের কাছ থেকে পাঁচ সের করে আলু কিনব।

সকলেই হ্যা করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। গোপাল দিব্যি বিনি পয়সার আলু কিনে বাড়ি ফিরল।

বন্ধুকে বাধ্য হয়েই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গোপালকে দশ টাকা পুরষ্কার দিতে হল। না দিলে হয়ত গোপাল কোনও সময় ১০০ টাকা হাতে তুলে নিয়ে হাওয়া করে দেবে। তার চেয়ে আগে দেওয়া ভাল।

বিয়ের ঘটকালি

গোপাল একবার একটি বিয়ের ঘটকালি করে ছিল। মেয়েটি খোঁড়া, ছেলেটি কানা। কনেপক্ষ পাত্র পক্ষ গোপালের মুখের কথায় উপর নির্ভর করেই বিয়ে পাকাপাকি করে ফেলেছিল। কনেপক্ষ জানে না যে বর কানা, আবার পাত্রীপক্ষ জানে না যে মেয়ে খোঁড়া। গোপারের ভীষণ নাম ডাকের জন্য কেউ কাউকে অবিশ্বাস করতে পারে নি। সবকাজ গোপালের উপরই ছেড়ে দিয়েছে।

নির্বিঘ্নে বিয়ে হয়ে যাবার পর পাত্রকক্ষের কর্তা গোপালকে ডেকে বললেন, কনেপক্ষের লোকেরা জানতেই পারেনি যে, বর কানা। বরকে কানা দেখলে কোন বাপ মেয়েই দিত না। এর জন্য আপনার কাছে বেশ কৃতজ্ঞ আমরা। এই বলে পাত্রপক্ষের লোকেরা কিছু পুরষ্কার বাবদ টাকা দিল। গোপাল তা মুখটি চেপে নির্বিবঘ্নে তাদেরকে কিছু না বলে নিয়ে নিল।

এদিকে কন্যাপক্ষের লোক এল। মেয়েটি যে খোঁড়া পাত্রপক্ষের লোকেরা জানিতেই পারেনি, কি বল গোপাল! এই বলে কন্যাপক্ষের লোকেরা গোপালকে কিছু পুরষ্কার দিল।

দুপক্ষের কাছে মোটা বকসিস পেয়ে পুলকে গোপাল মনে মনে হাসতে হাসলে বলল, আপনারা মহাশয় ব্যক্তি। তাহলে সব কথা খুলে বলি শুনুন, আপনার মেয়েটি খোঁড়া আর বরও কানা। এতে অবশ্য দুপক্ষের চিন্তা ভাবনা করার কোনও কারণই নেই।
গোপালের কথা শুনে বর পক্ষের আক্কেল গুডুম। বললেন, অ্যাঁ, বলো কি। পাত্রী খোঁড়া? আগে এ কথা আমাদের বলেননি কেন?
গোপাল বললে, নইলে মানাবে কেন দাদা? না মানালে আমরাই যে বদনাম। আমি তো কারও কাছে বদনাম শুনতে রাজি নই। এখন, আপনাদের আর কারোর কিছু বলার থাকলো না।

গোপাল ভাঁড় এর চিঠি লেখা

গোপাল লেখাপড়া বিশেষ কিছু জানত না। যদি বা লেখাপাড় কিছু জানত কিন্তু হাতের লেখা ছিল খুব খারাপ। কিন্তু রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ভাঁড় হিসাবে তার খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাড়া পড়শীরা তাই তাকে সমীহ করে চলত- কেউ কেউ বা বিভিন্ন প্রয়োজনে গোপালের সঙ্গে এসে দেখা করত পরামর্শ নিত, গোপালের বুদ্ধি নিয়ে প্রায় সকলে চলত।

একদিন এক বুড়ি এসে বলল, গোপাল ভাই, আমার একখানা চিঠি লিখে দাও না। আমার নছেলে পুরী থেকে দশক্রোশ দূরে নাগেশ্বরপুর গেছে। কোনও খবর পাচ্ছিনে বেশ কয়েকদিন হল। টাকা পয়সাও নাই যে কাউবে পাঠাব।

বুড়ির কথা শুনে গোপাল বললে, আজ তো আমি চিঠি লিখতে পারব না ঠাকমা।

কেন ভাই, আজ কি যে, তুমি চিঠি লিখতে পারবে না। অনেকদিন হয়ে গেছে আজ না লিখলেও নয়। আর তোমার দেখা সব সময়পাই না যে তোমাকে চিঠি লিখতে বলি। আজ দেখা পেয়েছি, একখানা চিঠি লিখে দাও না ভাই? আমি বুড়ো মানুষ কার কাছে যাব চিঠি লিখতে ভাই, তুমিই একমাত্র ভরসা।

আমার যে পায়ে ব্যাথ্যা গো ঠাকমা।

পায়ে ব্যথা তাতে কি হয়েছে? চিঠি লিখবে তো হাত দিয়ে? পায়ে কি তুমি চিঠি লিখবে নাকি। তোমার কথা শুনলে হাসি পায়। তোমার মত এমন কথা কোথাও শুনিনি।

গোপাল হেসে বলল, চিঠি তো লিখব হাত দিয়েই। কিন্তু আমার চিঠি অন্য কেউ যে পড়তে পারবে না। আমার লেকা চিঠি আমাকে নিজে গিয়ে পড়েদিয়ে আসতে হবে। আমার যে এখন পায়ে ব্যথা। এখান থেকে পুরী আবার পুরী থেকে দশ ক্রোশ দূরে নাগেশ্বরপুরে চিঠিটা তো আমি পুড়ে দিয়ে আসতে পারব না। তুমি অন্য কাউকে দিয়ে চিঠিখানা এবারকার মতো লিখিয়ে নাও, ঠাকমা। আমার পা ভাল হলে চিঠি লিখে দেব এবং নিজে দিয়ে পড়ে আসব।

বুড়ি মা এর পর আর কি বলবে। বাধ্য হয়ে চিঠি না লিখিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হল গোপালের বাড়ি থেকে।

কোলাকুলি

বিজয়ার পরদিন পথের মাঝে গোপাল অপরজনের সঙ্গে কোলাকুলি করল। কোলাকুলি করার সময় গোপাল অপরের ট্যাক থেকে একটি টাকা, আর অপরজন গোপালের ট্যাক থেকে কিছু খুচরো পয়সা বাগিয়ে নিল। সে খুচরো পয়সা গুনে দেখলে…. এক টাকারই খুচরা রয়েছে। গোপালের পকেটে মাত্র একটাকাই ছিল জেনে মনে মনে বেশ একটু ক্ষুন্ন হল, তখন গোপাল অপরজনকে বললে, এসো ভাই, আবার আমরা কোলাকুলি করি। যার ট্যাকে যা ছিল তাই ফিরিয়ে দিই। আমাদের উভয়ের যে একই পেশা, এই কোলাকুলির দ্বারা তো বেশ ভালই বোঝা গেল। এখন থেকে আমরা দুজন দুজনের বন্ধু।

বিয়ের সম্বন্ধ

গোপাল এক বাড়িতে প্রতিবেশীর মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক করতে গিয়েছিল। বরের বাপ ছেলেকে ডেকে বললেন, ওরে পদ্মলোচন তোকে দেখতে এসেছে রে- একবার এ ঘরে আয়। সকলে তোকে দেখতে চায় বাবা।
যে ছেলেটি ঘরে এল, সে ছেলেটি কানা। গোপাল বরের বাবাকে জিজ্ঞেস করলে, এই বর বুঝি? বরের বাবা বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ।
তখন গোপাল বললে, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন? তা বেশ রেখেছেন।

কান টানলেই মাথা আসে

পন্ডিত মশাই একবার মহারাজের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে নালিশ জানিয়ে বললেন, আপনার ছেলে মোটেই লেখাপড়া করছে না! পড়ার সময় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। আরও লেখাপড়ায় মাথা একেবারেই ঘামায় না।
রাজা ছেলের ওপর প্রচন্ড রেগে গিয়ে পন্ডিত মশায়কে বললেন, এবারও যদি পাঠশালায় যায়, বেশ কষে কান টানবেন।
মহারাজের কথা শুনে গোপাল সঙ্গে সঙ্গে বলল আপনি যথার্থই বলেছেন, কান টানলেই মাথা আসে। সকলে তখন হেসেই লুটোপুটি।

দাবা খেলা

গোপাল মাঝে মাঝে কারও না কারোর সঙ্গে নিজের বাড়ির দাওয়ায় বসে দাবা খেলতো। গোপালের সঙ্গে দাবা খেলার জ্ন্য প্রায়ই কেউ না কেউ দুই মাইল দূর থেকেও হেটে আসতেন। অন্ততঃ এক বাজি খেলতে না পারলে অথবা কারও সঙ্গে দাবায় হেরে গেলে গোপাল সে রাতে মোটেই ঘুমাতে পারতো না। সারারাত বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু ছটফট করত। দাবা খেলায় ভীষণ নেশা গোপালের বলতে গেলে, দাবা খেলার সময় গোপাল বাহ্যজ্ঞানই হারিয়ে ফেলত। একদিন গোপাল দাবা খেলছিল, আর এক চাল দিলেই কিস্তিমাত হয় আর কি?

এমন সময় বাড়ি থেকে একটা চাকর ছুটে এসে খবর দিলে, বাবু তাড়াতাড়ি বাড়ি চলুন। কর্তা মাকে সাপে কামড়েছে। কর্তামা ভীষণ কষ্ট পাচ্ছেন। ডাক্তার আনতে হবে।

গোপাল তখন দাবার নেশায় এমনই মত্ত যে চাল দিতে দিতে চাকরকে বললে, কাদের সাপ? কার হুকুমে কর্তা মাকে কামড়াল? সাপটার বিরুদ্ধে রাজার দরবারে নালিশ ঠুকে দিয়ে, এখনি ছুটে চলে যা একটু পরেই আমি যাচ্ছি।
চাকর বেচারা কর্তাবাবুর কথা শুনে হ্য করে দাড়িয়ে রইল।

গোপাল ও কবি

‘বিদ্যাসুন্দর’ কাব্যের রচয়িতা কবি ভারতচন্দ্র রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ছিলেন। আদি রস পরিবেশনের ব্যাপারে তাঁর সমকক্ষ তখনকার দিনে কেউ ছিলেন না। কৃষ্ণচন্দ্রেরও সমঝদার শ্রোতা ছিলেন, কবি রাজাকে বিদ্যাসুন্দর পড়ে শুনাচ্ছিলেন।
গোপাল রাজসভায় ঢুকে কবিকে কাব্যের পান্ডুলিপিটা কাৎ করে ধরে পড়তে দেখে চেচিয়ে বল উঠল, একি করছেন কবি? আপনার কাব্য যে রসে টই টম্বুর। কাৎ করবেন না দাদা, রস গড়িয়ে পড়বে। সোজা করে ধরুন।

গোপালের কথা শুনে রাজসভাস্থ সকলেই হো হো করে হেসে উঠলেন। কৃষ্ণচন্দ্র এরূপ সুন্দর কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে গোপালকে মনের মতো পুরষ্কৃত করলেন।

গোপাল ও নবাব

এক ভদ্রলোক মুর্শিদাবাদের নবাব দরবারে কাজ করতেন। প্রয়োজনে গোপালকে একবার নবাব দরবারে যেতে হয়েছিল। গোপালকে দেখেই ভদ্রলোক তার হাতে পঞ্চাশটি টাকা দিয়ে বললেন, দাদা দয়া করে টাকাটা আপনি বাড়ী গিয়ে আমার স্ত্রীর হাতে চুপি চুপি দেবেন, আমার বাড়ির অন্য কেউ যেন টের না পায়, তাহলে খুব অনর্থ হবে।

গোপাল টাকাকে ট্যাকে গুজে বললে, আপনি নিশ্চিত থাকুন মশায়, আপনার এই টাকা দেওয়ার কথা কাক পক্ষীতেও টের পাবে না। এমন কি, আপনি যার হাতে টাকা দিতে বলেছেন তিনিও নয়। মানে, গোপাল সে টাকাটা কাউকেও না দিয়ে নিজেই আত্মসাং করবার মতলবে রইল।

বরযাত্রী

গোপাল একবার বরযাত্রী হয়ে বিয়ে বাড়ীতে গিয়েছিল। কনে পক্ষের একজন বয়ষ্ক রসিক ব্যক্তি গোপালের সঙ্গে রসিকতা করার উদ্দেশ্যে বললে, এই যে গোপাল তুমিও দেখছি বরযাত্রী হয়ে এসেছ। জানো তো আমাদের এখানে অনেক বাদর আছে। এখানে বাদরের অত্যাচার ভীষণ। অবশ্য তোমার চেহারও বাদরের মত। বাদরদের মধ্যিখানে তোমাকে মানাবে ভাল কি বলো? বাদর যদি কেউ ইতিপূর্বে না দেখে থাকে- এ যাত্রায় বাদর দেখাও হয়ে যাবে। আর কথা খাওয়াও দেখবে।

গোপাল তখন কনেপক্ষের সেই ভদ্রলোককে বলল, মশায় এর আগেও আমি ঢের বাদর দেখেছি কিন্তু আপনার মতো এমন অসভ্য বাদর কোথাও কোনদিন দেখিনি! এবার ভদ্রলোক মুখের মাপমত জবাব পেয়ে একেবারেই চুপ।

গোপাল ও মা কালী

গোপাল একদিন পাশা খেলতে খেলতে দাতের যন্ত্রনায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল। অসম্ভব যন্ত্রণ যাকে বলে। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে শুয়ে পড়ে কাতরাতে কাতরাতে বলতে লাগল, দোহাই মা কালী! এ যাত্রায় আমার যন্ত্রণাটা কমিয়ে দাও….. আমি জোড়া পাঠা বলি দেব মা পুজো দেব ভাল করে তোমায় মা-

কিছুক্ষণ পরে মা কালীর কৃপায় তার যন্ত্রনার উপশম হল। সে আবার খোশ মেজাজে পাশা খেলতে লাগল মনের আনন্দে। গোপালের পাশা খেলার সাথী এক সময় গোপালকে বললে, মায়ের দয়ায় দাঁতের যন্ত্রণা তো চ্ট করে সেরে গেল। মায়ের কাছে তাহলে জোড়া পাঠা বলি দিচ্ছ তো? মনের বাসনা, পাঠা বলি হলে বলির মাংস খাওয়া যাবে। গোপাল পাশার চাল দিয়ে খোশ মেজাজে বললে, যন্ত্রণা আমার এমনিতেই সেরে যেত।

এ ব্যাপারে আর মা কালীর কেরামতি কোথায়? যন্ত্রনায় অস্তির হয়েকি বলতে কি বলে ফেলেছি, সেজন্য আবার জোড়া পাঠা বলি দিতে হবে নাকি? মা কালী আমার মাথায় থাক। তারপর গোপাল দিব্যি খোশ মেজাজে পাশা খেলতে লাগল। ওদের কথায় আর পাত্তা দিল না। খেলার সাথির মন খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কথায় বলে- ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বেশ কিছুক্ষণ পেরে গোপালের দাঁতের যন্ত্রণা আবার অসম্ভব রকম বেড়ে গেল।

এবারকার যন্ত্রণা আগের চেয়েও ভয়ানক। গোপাল যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে মা কালীর উদ্দেশ্য হাত জোড় করে কাতরাতে কাতরাতে বললে- হে মা করুণাময়ী, হে মা দয়াময়ী হে মা জগজ্জননী যে কথা বলেছি…. সেই কথাটিই ধরে নিলে মা? আমি কি সত্যি সত্যিই বলেছি তোমার কাছে জোড়া পাঁঠা বলি দেব না? এত বোঝ মা, ঠাট্টা বোঝ না? এবার খেলার সাথীর মুখে জোর হাসি ফুটে উঠল, বলির পাঁঠার প্রসাদ মাংস নির্ঘাত পাবে এই মনে ভেবে।

উটকো লোক

গোপাল একবার এক বড় মেলায় বেড়াতে গিয়েছিল। মেলায় গোপাল মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় একটা উটকো লোক এসে গোপালকি জড়িয়ে ধরলো আচ্ছা দাদা কাশিতে মরলে লোক স্বর্গে যায় আর ব্যাস কাশীতে মরলে নাকি গাধা হয়। কিন্তু যারা কাশি ও ব্যাসকাশীর ঠিক মাঝখানে মরে, তারা কি হয়? আপনি বলতে পারেন দাদা আমার জানতে ইচ্ছে?
গোপাল বললে- মশায়, তারা আপনার মতো উটকো হয়। কথা নেই বার্তা নাই চেনা নাই শুনা নাই…. দুম করে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন। একে বলে উটকো লোক।

আলুর গুদামে আগুন

একবার এক আলুর গুদামে আগুন লেগেছিল। গোপাল সেই পথ দিয়ে যেতে যেতে তা দেখতে পেয়ে, একটা মুদির দোকান থেকে, একটু নুন চেয়ে নিল। তারপর সেই গুদামের পোড়া আলু, নুন সহযোগে দিব্যি খেতে লাগল। কিছু দুরে গুদামের মালিক মাথায় হাত দিয়ে বসেছিল। গোপাল নুন দিয়ে আরামে পোড়া আলু খেতে খেতে তার কাছে দিয়ে জিজ্ঞেস করলে, মশায় আপনি কে?
এরূপ দুঃখিত ভাবে মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন কেন?

লোকটি বলল, আমি এই গুদামের মালিক। আমার চারটে আলুর গুদামের মধ্যে একটা পুড়ে সব শেষ হয়ে গেল। গ্রহের ফেরে খুব লোকসানের মধ্যে পড়ে গেলাম।

গোপাল নির্বিকারভাবে তাকে জিজ্ঞেস করলে, আচ্ছা আপনার বাদ-বাকি গুদাম যে তিনটি আছে সেগুলি কবে কবে পুড়বে বলতে পারেন? তাহলে আলু পোড়া খেতে পারব।

গোপালের কথা শুনে আলুর গুদামের মালিক, চটে উঠে লাঠি নিয়ে মারতে তাড়া করল। গুদাম পুড়ে যাওয়ায় বেচারার এমনিতেই মন মেজাজ খারাপ, তার উপর গোপালের এ হেন অলুক্ষণে কথা! বেগতিক দেখে গোপাল আর কোন কথা না বলে পালিয়ে বাঁচল। মনে মনে বলল বাবা বদমেজাজের চোটে সব আলূনি হয়ে গেল। তেল আক্রার এই বাজারে আলুভাজা বা আলুভাতের বদলে মুফতে আলু পোড়া খাওয়ার যে মজা সে কথা আর কোনদিন বলব না কোন বে আক্কেল ভদ্রলোককে।

স্মৃতি-শক্তি

গোপালের প্রখর ভাবে স্মৃতি-শক্তি ছিল। ভালভাবে বলতে হলে বলা যায় অসাধারণ। তার মনের পর্দায় যেন সবকিছু ছাপা হয়ে যায় অবিকল। হাবভাব এমনকি কথার টুকিটাকিও। সাধারণ মানুষের মধ্যে অমন স্মৃতি-শক্তি থাকার কথা নয়। একবার নিশ্চিব্দি পুরের জমিদার ঘোড়ায় চড়ে যেতে যেতে না পাড়ায় মোড়ে গোপালকে দেখেতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন গোপাল তোমার অসুখ সেরেছে তো?

গোপাল কোন জবাব দেওয়ার আগেই জোর কদমে ঘোড়া ছুটিয়ে নিশ্চিব্দি পুরের জমিদার সেদিন ওখান থেকে চলে গিয়েছিলেন। ঐ ঘটনার সাত আট বছর পরে, আবার নপাড়ার মোড়েই গোপালের সঙ্গে নিশ্চিন্দি পুরের জমিদারের হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। এবার কিন্তু জমিদার পাল্কি করে যাচ্ছিলেন। ভীষণ গরম পড়ে ছিল বলে পাল্কির দরজা খোলাই ছিল। হাওয়া লাগার জন্য জমিদার নতুন করে প্রশ্ন করা আগেই সেই সাত আট বছর আগেকার প্রশ্নের জবাব দিল, আমার অসুখ সেরে গেছে হুজুর। এখন আমি ভাল আছি।

জমিদার এ কথার মানে না বুঝতে পেরে, অবাক হয়ে গোপালের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণপরে যখন কথাটার মানে বুঝতে পারলেন তখন হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ধন্যি গোপাল তোমার দ্বারাই এটা সম্ভব। ঠিক মনে রেখেছ …

গোপাল ও বালক

এক বালক গোপালের বাগানে ফল পেড়ে খাচ্ছিল। প্রতিবেশী লোকেরা ছেলেটাকে ধরে নিয়ে এল বাগান থেকে। যথাসময়ে ছেলেটাকে গোপালের কাছে ধরে নিয়ে এসে হাজির করল। ছেলেটার বিচার করবার জন্য গোপালকে বলল দৈব ক্রমে সেই সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র আর প্রিয়বয়স্য গোপালের বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন। তার জন্য গোপাল ও সবিনয় মহারাজের উপর বিচারের ভার ছেড়ে দিল।

মহারাজ খুব গম্ভীর হয়ে সেই বালককে লক্ষ্য করে কয়েকটি উপদেশের বানী শুনালেন। চুরি করা ভীষণ দোষ, কারো কোন জিনিষ চুরি করা উচিৎ নয়। যে কোন লোক চুরি করলে ভীষণ শাস্তি পেতে হয়। এইরূপ অনেক কিছু কথা বলার পর মহারাজ সেই বালককে জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা তোমার যদি একটা বাগান থাকত আর সেই বাগানে ঢুকে তোমার মত কোন ছেলে যদি ফল চুরি করত তখন তুমি তাকে কি করতে তোমার মুখেই শুনতে চাই বলত দেখি?

বালক বিনিত হয়ে নম্রভাবে বলল, মহারাজ প্রথমবার আর কি করব? বুঝিয়ে সুঝিয়ে সে যাতে আর কোন দিন চুরি না করে এবং আপনার মত এই উপদেশের কথামত বলে সাবধান করে ছেড়ে দিতারম প্রথম বারের মত। তা ছাড়া আর কি করব বলুন।
বালকের এই কথা শুনে মহারাজ হেসে ফেললেন, মনে মনে ভাবলেন বাঃ ছেলের বিচার বুদ্ধি দেখছি বেশ সুন্দর, ঠিক আছে ওর কথা মত এবার একে সাবধান করে ছেড়ে দেওয়া হোক।

বলা বাহুল্য মহারাজ সাবধান করে বালককে ছেড়ে দিলেন। দেখো আর যেন দ্বিতীয়বার তোমার কথামত কোনদিন যেন চুরি না কর। এবারের মত তোমাকে মাফ করে দেওয়া হল তোমারই কথামত।

কানভারী

একদিন গোপালের কোনও বন্ধু এসে মহারাজকে কানভারী করার জন্য গোপনে জানালে, গোপাল আপনার একজন কর্মচারী। লোকটাকে আপনি খুব বিশ্বাস করেন। তাই তার হাতেই টাকাকড়ি খরচ করার ভার দিয়েছেন। তিনি আপনার অনেক টাকা সরিয়েছেন…… আপনি হিসেব মিলিয়ে দেখুন।

মহারাজ প্রথমে কিছুতেই লোকটিকে কথা কানে তুলতে চান না। বলেন-গোপাল আমার বিশ্বাসী লোক, সে কখনও অমন কাজ করতে পারে না। কোনদিন টাকা পয়সা এদিক ওদিক করবার লোক সে নয়।আমি তাকে বিশ্বাস করি’ তখন লোকটি দফায় দফায় গোপালের খরচের নমুনা বলতে লাগল। সে অমুক তারিকে অত হাজার টাকা গাপ্ করেছে… অমুক তারিখে অমুক সম্পত্তি নিজের নামে কিনেছে হিসাবের খাতায়……

অমুক তারিখে এক হাজার টাকা জমা দিয়েছে…… আবার অমুক তারিখে…. জাল রসিদ দাখিল করে, তিন হাজার টাকা বার করে নিয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি কত কথা বলে গেল…… মহারাজ এইসব বিষয় অবাক হয়ে শুনলেন, তারপর খাতাপত্র পরীক্ষা করে দেখলেন লোকটির সমস্ত কথাই সত্যি। কিন্তু সে টাকা মহারাজ নিজে থেকেই দিয়েছেন। যেমন দিয়েছেন প্রায় সবই মিলে যাচ্ছে, সেজন্য মনে মনে হাসতে লাগলেন।

তখন তিনি বললেন, আমার বাড়ীতে আমার অন্য কর্মচারী বা আমি কিছুই জানলাম না, অথচ, বাইরের লোক হয়ে তুমি এত সব খবর জানলে কি করে মশাই? গোপাল কি তোমাকে সব জানিয়েছে? লোকটি বললে, গোপালের যা আয় তার চাইতে ব্যায় অনেক বেশী। ও প্রচুর টাকা ওড়াচ্ছে অনবরত! তাই গোপালের নামে নালিশ করলাম সাবধান হওয়ার জন্য।

মহারাজ বললেন তা হটে। তোমার নাম-ধামটা বাপু আগে জানতে চাই। তুমি কোথায় থাক এবং তোমার নাম কি? লোকটি সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলে, আমার নাম? কেন মহারাজ? আমি কি আপনার চুরি করেছি নাকি যে, আমার নাম-ধাম জানতে চাইছেন? আমি আপনাকে সত্যি কথাই বলছি।

মহারাজ বললেন, কারণ দুই নম্বর আসামী বলে তোমাকে গ্রেপ্তার করতে হবে কিনা! তুমি হচ্ছো গোপালের পরামর্শদাতা ও বখরাদার। তা নইলে এমন সব গোপনীয় কথা খাতাপত্র না দেখেই তুমি জানতে পারলে কি করে? গোপাল যা কিছু করেছে, সব তোমারই পরামর্শমত। বোধ হয় ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া হয়েছে, তাই গোপালকে ধরিয়ে দিতে এসেছ-এই না? যাক নিজের চরকায় তেল দেও, পরের চরকায় তেল না দিলেও চলবে।
লোকটি মুখ নীচু করে চলে গেল।

গোপাল ও কল্কে

এখন বাবা তামাক খাচ্ছেন। গোপাল কলকে পাবার আশায় বসে আছে। গোঁসাই মাঝেমাঝে এমন জোরে টান দিচেছন যে তাতে গোপালের মনে হচ্ছে, এই বুঝি এবার গোঁসাইয়ের তামাক খাওয়া শেষ হলো। সে অমনি হাত বাড়াচ্ছে কলকের জন্যে। কিন্তু গোঁসাই এর তামাক খাওয়া আর শেষ হয় না।

শেষে গোঁসাইবাবা বলে উঠলেন কি হে! বারে বারে বেড়ালের মত থাবা বাড়াও কেন? কিছু দেখছ নাকি?
গোপাল বললে-ইদুর ভেবে হাত বাড়িয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি এটা ছুঁচো-ছাড়া আর কিছু নয়।
গোঁসাইবাবা এবার তোতলামির হাসি হেসে কলকেটা গোপালকে দিয়ে বললেন-এবার পেসাদ টান বাবা। আমার শাস্তি হয়ে গেছে।

গোপালের ঘোড়া

গোপাল একটা নতুন ঘোড়া কিনেছে। গোপাল তাই নিজে সখ করে তার সাজ পরাতে গিয়েছে। নিজের পছন্দমত কোনমতে সাজ এঁটে দেওয়ার পর, একটা চাকর বলে উঠলো। বাবু সাজ উলটো হলো যে।

গোপালের নিজের মনেও সন্দেহ হচ্ছিল যে, তার হয়তো সাজ পরানো ঠিক হয়নি। কিন্তু তাই বলে চাকরে ভুল ধরবে? এ হতেই পারে না।

তিনি চটে বললেন কেন? উলটো হবে কেন রে বোকা? চাকর বললে, এ দিকটা থাকবে আপনার মুখের দিকে ও দিকটা থাকবে পিঠের দিকে। তাহলেই ঠিক হবে বাবু। গোপাল ধমকে বলল ব্যাটা ফাজিল মূর্খ। তুই কী করে জানলি, আমি কোন দিকে মুখ করে বসবো তুই যেন সবজান্তা হয়ে বসে আছিস্? গোপাল কোনমতে ছোট হতে পারছিল না।

সূর্য উঠেছে কিনা

একদিন জরুরী দরকারের জন্য গোপাল খুব সকালে উঠেই রাজদরবারে যাবার কথা। সে স্ত্রীকে বললে, সে ঘুমিয়ে পড়লে স্ত্রী যেন তাকে ডেকে দেয় খুব ভোর বেলায়। ভোর হয়নি। স্বামীর ঘুম আগেই ভেঙ্গে গেল। সে বললে, দেখ তো, বাইরে সূর্য উঠল কিনা আমাকে বেরুতে হবেতাড়াতাড়ি। রাজবাড়িতে ভীষণ দরকার। স্ত্রী বললে ওমা, বাইরে যে অন্ধকার। কি দেখব? গোপাল চেঁচিয়ে বললে অন্ধকারে দেখতে না পাও, আলোটা জ্বেলে নিয়ে দিয়ে দেখলেই তো পারো সূর্য উঠেছে কিনা।

গোপালের গোয়েন্দাগিরি

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময় যান-বাহনের খুবই অসুবিধা ছিল। স্থল-পথ ছাড়া জল-পথ দিয়েও লোক যাতায়াত করত। জল পথে বজরাই তখনকার দিনে যাতায়াতের একমাত্র উপায়।

এক মহিলাকে প্রায়ই দেখা যেত করে বজরায় উঠতে এবং এদিক ওদিক ঘোরা ফেরা করতে একটি কাপড়ে জড়িয়ে শিশু কোলে করে। শিশুটিকে সর্দ্দি কাশির ভয়ে সব সময় কাপড় জামা দিয়ে জড়িয়ে ঢেকে রাখতেন, কেউ দেখলে মনে করত এক বছরের মত বয়স শিশুর সর্দ্দি কাশির ভয়ে এমনি ভাবে জড়ান।

গোপাল মাঝে মাঝে পথে বেড়াতে গিয়ে এই ভদ্রমহিলাকে দেখত এবং মনে মনে শিশুটির কথা ভাবত। একদিন কথা প্রসঙ্গে গোপাল মহারাজকে এই মেয়েটির কোলের শিশুটির ব্যাপারে তার সন্দেহের কথা খুলে বলল।

তখনকার দিনে দেশে প্রচুর চুরি ডাকাতি হত চুরি করা মালপত্র সেইসব জলপথে পাচার হয়ে যেত অন্য জায়গায়।

একদিন হঠাৎ যেই মেয়েটির সঙ্গে বজরায় দেখা, অমনি গোপাল ও ওর সঙ্গীরা মেয়েটিকে কোলের শিশু দেখাতে বলে। মেয়েটি কোন মতে শিশু দেখাতে রাজী হয় না। তখন গোপালরা জোর করে মেয়েটিকে কোলের ছেলেটিসহ রাজবাড়ীতে হাজির করে। মহারাজের সমনে ছেলেটিকে কোল থেকে নামাতে দেখা গেল-ছেলে নয়, জড়ানো ছেলের মধ্যে যত রাজ্যের সোনা-দানা চোরাই মাল।

বুদ্ধি ও সাহসের বলে চোর ধরার জন্য ও দেশের অনেক-উপকার করার জন্য মহারাজ গোপালকে অনেক পুরষ্কার দিলেন।

ঘ্রাণেন অর্দ্ধ-ভোজনং

এক হোটেলে হোটেলওয়ালা ও তার কোন বন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা হচ্ছিল, এমন সময় দেখে যে গোপাল হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে। ওই বন্ধুটি হোটেলের বন্ধুকে বলল, ওই লোকটাকে জব্দ করতে পারবে? হোটেলওয়ালী বলল এ এমন কি?

রাস্তায় হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে গোপাল এক বন্ধুর জন্যে অপেক্ষা করছিল। হোটেলে মাংস-রান্না হচ্ছে। হঠাৎ হোটেলওয়ালা গোপালকে জব্দ করার জন্য ছুটে এসে তাকে বললে, মশাই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাংসের গন্ধ শুঁকছেন নিশ্চয়ই দাম দিন শিগগির। গোপাল তো অবাক। কতক্ষণ পর বিস্ময়টা কাটিয়ে উঠে বললে তোমার মাংসের গন্ধ শোঁকবার জন্যে আমি এখানে দাঁড়াইনি। দাঁড়িয়েছি, এক বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করছি ওর দরকারের জন্য। রাস্তাটা তো তোমার হোটেলের ইজারা মহল নয়। রাস্তাটা সরকারের অতএব, তোমার বলার কিছু নেই।

হোটেলওয়ালা ঝাঁজের সঙ্গে বললে তা’তে কি হয়েছে? ঘ্রাণেন অর্দ্ধ-ভোজনং। গন্ধ শুঁকলেই অর্দ্ধেক খাওয়া হলো। এক ডিশ মাংসের দাম আট আনা, তার অর্দ্ধেক চার আনা আপনাকে দিতে হবে।

তখন আট আনাতেই বড় এক প্লেট মাংস পাওয়া যেত। গোপাল চার আনার একটি সিকি পকেট থেকে বার করে হোটেলওয়ালার কানের কাছে ঠং ঠং করে বাজালে বারকতক। তারপর আবর সেটিকে পকেটে রেখে দিয়ে বললে ঘ্রাণে যদি অর্দ্ধেক-খাওয়া হয়, তবে শ্রবণেও অর্দ্ধেক পাওয়া হয়েছে। পয়সার বাদ্যি শুনেছো। গন্ধ-শোঁকার সঠিক দাম পাওয়া গেছে তোমার।

কথা কাটাকাটি শুনে সেখানে যেসব পথচারী দাঁড়িয়ে ভিড় করেছিলেন, তারা হেসে উঠলো হো হো কর। হোটেলওয়ালা মুর্খের মত জবাব পেয়ে মুখটি চুর্ন করে হোটেলের ভিতর চলে গেল গোপালের উপর টক্কর দেওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু গোপালকে জব্দ করতে এসে নিজেই জব্দ হয়ে গেল জব্বর ভাবে।

গোপালের সূক্ষ্ম বিচার

লোক পরম্পরায় গোপালের সূক্ষ্ম বিচার বৃদ্ধি দেখে এক প্রতিবেশী তার মোকদ্দমা চালাবার জন্য গোপালকে অনুরোধ করে। কিন্তু গোপাল মোকদ্দমার কাহিনী শুনে বারবার না-না করা সত্ত্বেও প্রতিবেশী লোকটি নাছোড়বান্দা হওয়ায় বাধ্য হয়ে গোপাল প্রতিবেশীর মোকদ্দমাটি হাতে নেয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই মামলার হার হয়।

ভদ্রলোক কাঁদতে কাঁদতে বললে এ কি করলেন, আমার সব গেল। তখন গোপাল বলল, দেখুন ব্যারাম সেরে উঠতে উঠতেও লোক অনেক সময়ে হার্টফেল করে মারা যায়। তাকে ব্যারাম-মরা বলা যেতে পারে না। আপনার ব্যাপারটও ঠিক সেই রকম। মামলার বিচারে আপনি হারেন নি। হাকিমেরা মূলত তিনটি বিষয়ের উপর বিবেচনা করে রায় দেয় সাধারণত- তিনটি বিষয় হল অনুমান, প্রমাণ এবং স্বীকারোক্তি।

অনুমানটাও আপনার স্বপক্ষে ছিল, অর্থাৎ যে-কেউ মামলার বিবরণ শুনলে বলতে বাধ্য ছিল যে বিবাদী দোষী। হাকিমও নিশ্চয়ই তাই ভেবেছেন। কিন্তু অনুমানের উপর নির্ভর করে তো আর রায় দেওয়া চলে না।

দ্বিতীয়তঃ হলো প্রমাণ। প্রমাণ করা এত শক্ত যে, ওর ভেতরে শেষ পর্যন্ত গলদ থেকেই যায়। আমি আপনার মামলা প্রমাণ করে ছেড়েছি, এ কথা যাকে জিজ্ঞাসা করবেন সেই বলবে, কিন্তু ঐ যে বললাম-গলদ রয়ে গেছে গোড়ায়। থাকতেই হবে গলদ! বিপক্ষের উকিল আমাদের সব অকাট্য প্রমাণগুলি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

তৃতীয়তঃ বাকি রইল স্বীকারোক্তি। আসামী লোকটা যদি ভদ্রতা করে দোষ স্বীকার করে যেতো, তাহলে আর কোন কিছুতেই আটকাতো না আমাদের। কিন্তু তা সে কোনমতেই করলে না কিনা! তাতে আমি আর কি করতে পারি বলুন। মামলা জেতবার আগেই তো হার হলো। ব্যায়রাম থেকে সেরে উঠতে উঠতে হার্টফেল। এতে বলুন আমার কি দোষ আছে? কারণ এর বেশী আর ভদ্রলোককে কিছু বলতে পারেই না গোপাল।
ভদ্রলোক রেগেই চলে গেলেন।

গোপাল ও মৌলবী

শেখ আমীরশাহ খুব বিচক্ষণ মৌলবী ছিলেন। হিন্দুশাস্ত্রেও তাঁর বেশ দখল ছিল। তারই জোরে গোপালকে তিনি অনেক সময়ে ঠকাবার চেষ্টা করেন। অবশ্য তার ফলে নিজেই জব্দ হতেন সর্বদা। কিন্তু তাতে লজ্জা নেই তাঁর। বার বার গোপালকে ঠকাবার চেষ্টা করেও বুদ্ধিমান গোপালকে কোনমতেই ঠকানো যায় না বরং শেখ আমীরশাহই বারবার ঠকেন।

একদিন গোপান ভিন গাঁয়ে এক বন্ধুর বাড়িতে গেছেন। শেখ আমীরশাহও সেই বন্ধুর বাড়িতে সেইদিন নিমন্ত্রিত। গোপাল গিয়ে বন্ধুর বাড়িতে পৌঁছে দেখেন শেখ আমিরশাহ ভোজনে বসেছেন। গোপাল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী খাচ্ছেন মৌলবী সাহেব?’

শেখ সাহেব শাস্ত্রের মারফত রসিকতা করবার লোভ সামলাতে পারলেন না এবার। বললেন, ‘এই যে গোপাল, তোমাদের অবতার ভোজন করছি।’ তিনি মাছ খাচ্ছিলেন, এবং মৎস্য হলো দশ-অবতারের প্রথম অবতার।

গোপালেরও শাস্ত্রজ্ঞান বেশ প্রখর। একথা শেখ সাহেব বেশ ভালোভাবেই জানেন।

গোপাল অর্থটা অন্যরকম বুঝবার ভাণ করলেন। তিনি বললেন, ‘অবতার? তৃতীয় অবতার নিশ্চয়ই?’

শেখ সাহেব ‘তোবা, তোবা’ করে লাফিয়ে উঠলেন ভোজন ত্যাগ ক’রে। কারণ হিন্দুদের তৃতীয় অবতার হলো–বরাহ বা শূকর অবতার এবং শূকরের মাংশ হলো মুসলমানদের পক্ষে নিষিদ্ধ খাদ্য।

বেশি জব্দ হয়েই সেদিন শেখ সাহেবকে উপোসেই থাকতে হলো। কারণ তিনি সেদিন আর কিছু খেতে পারলেন না। এদিকে গোপাল বন্ধুর বাড়িতে বেশ পেট ভরেই খেয়ে মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বিদায় নিলেন। এবারও শেখ সাহেব হলেন ভীষণ জব্দ। তিনি খুব ব্যথিত হয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন আর কোনদিনও গোপালের সঙ্গে খারাপ রসিকতা বা খারাপ ব্যবহার করবেন না।

গোপালের পাঞ্জাবি

গোপাল নতুন পোষাক করিয়ে এনেছে। কাল রাত্রে তার বিয়ে। এই পোষাক পরেও গোপাল বিরক্তিভাবে তার মাকে বলল, ‘জানো মা, দর্জি ব্যাটা আমার পাঞ্জাবীটা লম্বায় দুই ইঞ্চি বড় করে ফেলেছে।’

পরদিন সকালবেলায় গোপাল জিনিস-পত্র কেনা-কাটা করবার জন্যে বেরিয়ে গেল। তখন মায়ের মনে হলো, বেচারার পাঞ্জাবীটা দুই ইঞ্চি লম্বা হয়েছে। কেটে ঠিক করে দিলে হয় তো! তিনি কাউকে কিছু না বলে উপরে উঠে গেলেন এবং ছেলের ঘরে বসে পাঞ্জাবীটা নিচ থেকে দুই ইঞ্চি কেটে বাদ দিয়ে দিলেন। তারপর কাটা মুখটা সেলাই করে রেখে নিচে নেমে এলেন।

গোপালের বাড়িতে ছিল দুই বোন। গত রাত্রিতে খাওয়ার সময় দাদার মন্তব্য তারাও শুনেছিল। ওই রকম বেমানান লম্বা পাঞ্জাবী প’রে বিয়ে করতে গেলে দাদাকে দেখে সবাই হাসবে, এ জিনিস তাদের সবার অসহ্য মনে হল। কিন্তু কেউ কাউরে নিজেদের মনের কথা খুলে বলল না। কিছু পরে বড় বোন আবার দুই ইঞ্চি কেটে বাদ দিয়ে সেলাই করে দিল। তারপর ছোটবোনও চুপি চুপি ঘরে প্রবেশ করে পাঞ্জাবির ঝুল নিচ থেকে আরো দুই ইঞ্চি কেটে সেলাই করে দিল। এদের কাজ কেউই জানতে পারল না।

সন্ধ্যাবেলায় বিয়ের সাজ পরতে গিয়ে গোপালের চক্ষুস্থির যে পাঞ্জাবী দুই ইঞ্চি লম্বা ছিল, তা উলটে এখন চার ইঞ্চি খাটো কি ক’রে হলো, তা সে কিছুতেই বুঝতে পারল না। সে ঘোড়ার গাড়ি ডেকে দোকানে ছুটল এর কারণ জিজ্ঞাসা করতে। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করাতে সে কিছুই বুঝতে পারল না। গোপাল রেগে মেগে দোকানীকে দু’চার কথা শুনিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে এলো।

বাড়ি এসে সকলের মুখে সব কথা শুনে গোপালের মেজাজ আরো খারাপ হলো। কিন্তু অন্যের উপর রাগ করে তো বিয়ে না করে থাকা যায় না। বাধ্য হয়ে গোপাল তাড়াতাড়ি বাজারে গিয়ে আবার আর একটা পাঞ্জাবী কিনে তাই পরে রেগে-মেগে বিয়ে করতে গেল।

গোপালের ন্যায়

কুসঙ্গে পড়ে এক বালক পিতা-মাতাকে খুন করেছিল, স্রেফ টাকা পয়সা হস্তগত করার জন্যে। বালকের দাদা মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় সুবিচারের আর্জি পেশ করল। বিচারে তার অপরাধ যখন প্রমাণ হয়ে গেল, তখন মহারাজের এক সভাসদ উঠে বক্তৃতা শুরু করলেল, ‘ধর্ম্মাবতার! অপরাধ গুরুতর বটে, তবে আমি বালকটির জন্য মহামান্য মহারাজের দয়া ভিক্ষা করছি। কারণ, বালকটি এখন পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ।’

সঙ্গে সঙ্গে রাজসভার চারদিকে চাপা হাসি ও গুঞ্জন শুনে তিনি বেকুবের মত চারদিকে তাকাতে লাগলেন। কেন তিনি কি বেঁফাস কিছু বলছেন?

তখন গোপাল উঠে বলল, ‘ভেবে দেখুন, যে টাকার লোভে মা-বাবাকে হত্যা করতে পারে, সে তো পিতামাতার স্নেহের ঋণ উড়িয়ে দিয়ে তাদের পরিচয় মন থেকে আগেই মুছে ফেলেছে, তখন সে পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ হয়েছে বলা যায় কি করে? অতএব, ওই পশুকে মার্জ্জনা না করাই উচিত। মহারাজ তখন বললেন, গোপাল ঠিক কথাই বলেছে–এর অবশ্যই সাজা হওয়া উচিত।’

গোপাল ভাঁড়ের ভাইপো

গোপাল ভাঁড়ের ভাইপো আর তার স্ত্রীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বেধেছে। মধ্যস্থতা করতে এগিয়ে গেলেন গোপাল। বললেন, ‘বলি কী নিয়ে এত ঝগড়া হচ্ছে শুনি?’

গোপালের ভাইপো বলল, ‘দেখুন তো কাকা, আমি আগামী বছর একটা দুধেল গাই কিনব বলেছি। আর আমার স্ত্রী বলছে, সে নাকি গাইয়ের দুধ দিয়ে পায়েস রাঁধবে।’ ভাইপোর স্ত্রীও সমান তেজে চেঁচিয়ে উঠল।

দু হাত তুলে দুজনকে থামতে ইঙ্গিত করে বললেন গোপাল, ‘আস্তে আস্তে! গাধা নাকি তোরা?’

দুজন একটু ঠান্ডা হলে গোপাল ভাইপোকে বললেন, ‘আরে গাধা, তোর বউয়ের পায়েস রাঁধা তো পরের কথা। আমি যে বাড়ির পেছনে সবজির বাগান করেছি, সেসব যে তোর গরু খাবে, সে খেয়াল আছে?’

গোপন কথা

মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র গোপাল ভাঁড়কে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে একটা গোপন কথা বলব, কাউকে বলবে না তো?’
‘আপনার কোন কথাই আমি মনোযোগ দিয়ে শুনি না’- গোপালের উত্তর!

তোমার পালা

ছোটবেলা গোপাল ভাঁড় কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গেলে বুড়োরা তাকে ক্ষেপাত আর হাসত, ‘গোপাল, এর পর তোমার পালা।’ শুনে গোপালের খুব রাগ হত। বুড়োদের কিভাবে জব্দ করা যায়, সেই পথ খুঁজতে লাগল এবং এক সময় পেয়ে গেল। শবদাহ আর শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানে গিয়ে ঐসব বুড়োদের বলতে লাগল, ‘এর পর তোমার পালা!’ –

বিদেশী পথিক

এক বিদেশী পথিক রাত্রে অজানা জায়গায় এসে পড়েছে। তার উপর বৃষ্টি ও ঝড় নামল খুব জোরে। এই ঘন অন্ধকারে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এ সময় কোথায় আশ্রয় না নিলে নয়। সে পথের ধারে এক বাড়ির দরজায় বার বার আঘাত করতে লাগল। এ গৃহ-স্বামীটি হচ্ছেন গোপাল। তিনি উপর থেকে জানালা খুলে জিজ্ঞেস করলেন, কে হে বাপু তুমি? এত রাতে কড়া নাড়ানাড়ি করছ কেন? পথিক। আজ্ঞে আমি বহুদূর থেকে আসিয়াছি, বিদেশি পথিক। গোপাল।

এখানে আপনার কি চাই? পথিক। রাত্রিটা এখানে থাকতে চাই মহাশয়। গোপাল। তা থাকতে পারো এখানে। তার জন্য আমাকে ডাকবার কোন দরকার ছিল না তো। ওটা সরকারী রাস্তা, যে কেউ ওখানে থাকতে পারে। বাড়ির বাইরের এই আশ্রয়টুকুর জন্য প্রার্থনার কোন প্রয়োজনই বা কী? না না, আমার কোন আপত্তিই নাই। তুমি নিশ্চিন্ত মনে থাকতে পার। কিন্তু পরে সেই পথিককে আদর করে ঘরে ডেকে নিয়ে খেতে ও আশ্রয় দিয়ে এবং শুকনো কাপর চোপড় দিয়ে তার সেদিন বহু উপকার করে ছিল।

Final Word
ধন্যবাদ বন্ধুরা, আশা করি উপরের গোপাল ভাঁড় এর গল্পগুলি পরে আপনাদের ভাল লেগেছে। দয়া করে আপনার মতামত নিছের কমেন্ট বক্স এ কমেন্ট করে জানাবেন। এই রকম আরও মজাদার গল্পের আপডেট পেতে আমাদের ওয়েবসাইট টি subscribe করবেন।

এই রকম মজাদার গল্প -র জন্য GOOGLE-এ গিয়ে আমারদের ওয়েবসাইট টি সার্চ করুন।

আরও পড়ুন-

꧁Bengali Love SMS 2021꧂ | বয়ফ্রেন্ড গার্লফ্রেন্ড-এর জন্য ভালবাসার এসএমএস

꧁Birthday Wish SMS In Bangla 2021꧂| Best Unique Bangla Birthday Wish SMS

Bengali Shayari | ꧁100 Latest Bengali Shayari Collection꧂

2 thoughts on “Gopal Bhar Golpo Collection 2021 | বাংলা মজার গল্প”

Leave a Comment